ফ্রান্সজুড়ে আবারও বিক্ষোভ-ধর্মঘট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ধর্মঘট পালন করেছেন লাখো শ্রমিক। কয়েক সপ্তাহ ধরে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এ কর্মসূচি পালিত হয়। এদিন কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধলে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।
ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স বর্তমানে ভয়াবহ আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। সামনে দেশটিতে নির্বাচন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের ভোটের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। জনমত জরিপে এখন পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থিরা।
শ্রমিক সংগঠন সিজিটি জানিয়েছে, বিক্ষোভে পুরো ফ্রান্সে ১৬ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার। এর আগে দেওয়া ছয় লাখের হিসাব সংশোধন করে এ সংখ্যা জানায় মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু প্যারিসেই বিক্ষোভে অংশ নেন ৬০ হাজার মানুষ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫৩ পুলিশ কর্মকর্তা। প্যারিসের সমাবেশে সিজিটি নেতা সোফি বেনে বলেন, আজ প্রশ্নটা এই নয় যে, আমরা জিতব কিনা; বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কতটা আদায় করতে পারব।
ইউরোপজুড়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের ঢেউয়ের মধ্যেই এ ধর্মঘটের আয়োজন করা হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জার্মানি, স্পেন, গ্রিস, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের তরুণরাও একই ধরনের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনের মূল কারণ ছিল শিক্ষার নিম্নমান ও প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ। একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্য নিয়েও ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ এক পর্যায়ে রূপ নেয় সহিংস দাঙ্গায়। কয়েক বছরের মধ্যে ফ্রান্সে সেটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা। সর্বশেষ শ্রমিক সংগঠনগুলো সব খাতে মজুরি বাড়ানো এবং করব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু বিক্ষোভের ওপর পুলিশের বিধিনিষেধ নিয়েও অভিযোগ তুলেছে তারা।
মিছিলগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ থাকলেও লিওঁসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। লিওঁতে অন্তত একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।
লিওঁর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আঙুর চাষি মার্টিন থিবার্জে বলেন, ফরাসি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে একত্র করেছে এই আন্দোলন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। আমরা মর্যাদাপূর্ণ মজুরি চাই।
মার্সেইয়ে ৩১ বছর বয়সি সমাজকর্মী লেয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, প্রতিটি পয়সার হিসাব করে চলতে চলতে আমি ক্লান্ত। তিনি আরও বলেন, এই সামাজিক আন্দোলন আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। এদিকে প্যারিসে আইফেল টাওয়ার ও আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ সারাদিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
সরকার জানিয়েছে, দেশটির তিন হাজার ৭০০টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে অবরোধ করা হয়েছে। তবে একটি ছাত্র সংগঠনের দাবি, বিক্ষোভের কারণে প্রায় এক হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নেন।
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। পাশাপাশি রেলকর্মী, সরকারি হাসপাতাল ও ডাক বিভাগের কর্মীদের সংগঠনগুলোও এ কর্মসূচিতে যোগ দেয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাককর্মী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহনকর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ফ্রান্সের কয়েকটি বড় শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভের দিনটিতে দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলের মোট কর্মীর প্রায় ১৩ শতাংশ ধর্মঘটে অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।



