ড্রোন হামলায় আতঙ্কে জাপোরিঝিয়া: এক হামলায় নিহত ৫০
ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের গ্রামগুলোতে রুশ হামলা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। একসময় আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল এখন ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে — গত ২ নভেম্বর এক হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন।
ভলোদিমিরের গ্রামে এখন মাত্র আটজন মানুষ বেঁচে আছেন — এটাই তাঁর মনে থাকা শেষ হিসাব। গত সপ্তাহে তিনি প্রিওব্রাজেনকা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন। গ্রামটি জাপোরিঝিয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটারের বেশি দূরে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেলারে ছিলাম, তখন তারা ড্রোন দিয়ে আমাদের ওপর বোমা ফেলতে শুরু করে।’ তাঁর লাল, ফোসকা পড়া হাত দুটি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, আমি পুরোপুরি পুড়ে গেছি।’
জাপোরিঝিয়া শহরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে এখন বসে আছেন ভলোদিমির। জাপোরিঝিয়ার দক্ষিণের গ্রামগুলোতে রুশ হামলা ক্রমেই বাড়ছে।
২ নভেম্বর এ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটিতে নয়টি রুশ গ্লাইড বোমা কোমিশুভাখা শহরে আঘাত হানে। এতে অন্তত ৫০ জন নিহত হন। নিহতদের অনেকে একটি স্থানীয় স্কুলে মানবিক সহায়তা নিতে জড়ো হয়েছিলেন। আরও কয়েকজন এখনো নিখোঁজ — ধ্বংসস্তূপের নিচে তাঁরা চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বোমা ও ড্রোনের অবিরাম হুমকি দৈনন্দিন জীবনকে প্রায় অসহনীয় করে তুলেছে।
গত তিন বছরে এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, সেনাবাহিনীর আর মাটিতে পা রাখার প্রয়োজন নেই। মাথার ওপরে রুশ ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোনের আগমন প্রায়ই রুশ পদাতিক বাহিনীর ধীর অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
বহু নথিভুক্ত ভিডিওতে দেখা গেছে, এসব ড্রোন রাস্তায় যানবাহন ও বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে। ইউক্রেনীয়দের ভাষায়, খেরসন, ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কসহ বিভিন্ন শহরে ড্রোন বেসামরিকদের পিছু নিয়েছে। এখন জাপোরিঝিয়াতেও একই সতর্কসংকেত দেখা যাচ্ছে।
শহর প্রশাসন বাসিন্দাদের রক্ষায় যা পারছে করছে — কসমস এলাকায় রাস্তা ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপরে ড্রোন-বিরোধী জাল বসানো হয়েছে। তবে শহরজুড়ে তক্তা লাগানো জানালা ও বোমায় ধ্বংস হওয়া ভবন দেখিয়ে দিচ্ছে, ড্রোন এসে পড়ার পর ক্ষতি কমানো কতটা কঠিন।
আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা ডেনিস নিশ বলেন, ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে’ ভলোদিমির যে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন, সেটি অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
আশ্রয়কেন্দ্রের অনেকেই বয়স্ক বা চলাফেরায় সীমাবদ্ধ। কারও কারও কাছে স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, ফলে সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যরা জাপোরিঝিয়াতেই থাকতে চান — নিজেদের পুরোনো বাড়ির কাছাকাছি, এই আশায় যে যুদ্ধ শেষ হবে এবং তাঁরা ফিরে যেতে পারবেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাপোরিঝিয়া হাজার হাজার অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার দখলে যাওয়া মারিউপোল ও মেলিতোপোলের মতো শহর থেকে মানুষ এখানে এসেছেন।
এখন নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় যাঁরা একসময় নিরাপত্তার জন্য জাপোরিঝিয়ায় পালিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ আবারও চলে যেতে বাধ্য হওয়ার মুখে পড়েছেন।
ড্রোন-বিরোধী জালের নিচে একটি ফুলের দোকানে কাজ করা আলিনা বলেন, ‘অবশ্যই আমাকে হয়তো চলে যেতে হবে, তবে আমি চাই না।’ তিনি প্রায় প্রতিদিন রুশ ড্রোনের গুঞ্জন শুনতে পান।
নদীর ধার ধরে যাওয়া প্রিবেরেজনা হাইওয়ের পাশে প্রতিটি পেট্রোল পাম্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুরক্ষামূলক জালে ঢাকা। সেখানকার এক পেট্রোল পাম্পের কর্মী নাতালিয়া বলেন, ‘এটা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক, সবকিছু উড়ে বেড়াচ্ছে। আজই একটি ড্রোন আমাদের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে।’
সেদিন সকালেই রুশ বান্দেরল ক্ষেপণাস্ত্র — এক ধরনের কম খরচের জেট-চালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র — একটি শপিং মল ও শহরে ঢোকার প্রধান সেতুতে আঘাত হানে। একটি এফপিভি ড্রোন শহরের একটি বাসেও আঘাত করে।
তবু জাপোরিঝিয়ায় স্বাভাবিক জীবনের চিহ্ন এখনো আছে। রেস্তোরাঁর বারান্দায় ঝুলছে ঝলমলে আলো, কিছু রাস্তায় এখনো প্রাণচাঞ্চল্য রয়েছে।
মানুষ ধীরে ধীরে প্রতিটি নতুন হুমকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। প্রথমে রাস্তা জালে ঢাকা পড়ে। তারপর শহরের বাসের ছাদে ড্রোন জ্যামার বসে। সেতুগুলোতে হামলার গর্ত দেখা যায়। শিশুরা ড্রোন শনাক্তকারী যন্ত্র হাতে হেঁটে বেড়ায়।
নিশ বলেন, সময় এলে শহর খালি করার জন্য কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ‘শহরে কতজন মানুষ বাকি আছে, তা হিসাব করা খুবই কঠিন, কারণ প্রতিদিনই মানুষ জাপোরিঝিয়া ছেড়ে যাচ্ছে।’



