তরুণ ভোটারদের ঢেউয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়

২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাতে সাহায্য করা তরুণ ভোটাররা এবার সিদ্ধান্তমূলকভাবে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁদের ভোট মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড রিসার্চ অন সিভিক লার্নিং অ্যান্ড এনগেজমেন্টের (সার্কল) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি গত ৩০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় আনুমানিক ৩১ শতাংশ তরুণ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন, এবার তার পরেই রয়েছে এই হার।
৪৫ বছরের বেশি বয়সী ভোটাররা দুই দলের মধ্যে মোটামুটি ভাগ হয়ে গেলেও ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটাররা কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে ৩৫ পয়েন্টের ব্যবধানে ভোট দিয়েছেন। জাতি, লিঙ্গ, নৃগোষ্ঠী ও শিক্ষার স্তর নির্বিশেষে এই ব্যবধান দেখা গেছে। সার্কলের পরিচালক লিলা স্ট্রং বলেন, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এই +৩৫ ঝোঁক ২০১৮ সালের ব্লু ওয়েভের সঙ্গে মিলে যায়, যে নির্বাচনে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো জনপ্রিয় ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
জনগোষ্ঠীভিত্তিক হিসাবেও বড় বদল দেখা গেছে। ২০২৪ সালে লাতিনো তরুণরা সামান্য ব্যবধানে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, এবার তাঁরা +১০ থেকে +১৫ ব্যবধানে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। ২০২৪ সালে তরুণ শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের ৬৩ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, এবার তাঁদের ৫৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তরুণ শ্বেতাঙ্গ নারীদের সমর্থনও ২০২৪ সালের তুলনায় +১৫ বদলেছে। গ্রামীণ ভোটাররা ২০২৪ সালে ৫০ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দিলেও এবার ৬০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন।
সার্কলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া তরুণদের ১৫ শতাংশ এবার ডেমোক্র্যাট হাউস প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। ফল এতটাই সিদ্ধান্তমূলক হয়েছে যে ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রাজ্যে তরুণ ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে রিপাবলিকানরা প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছেন।
ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আইওয়া, মেইন, মিশিগান, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলাইনা, নেব্রাস্কা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নেভাদা, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, টেক্সাস ও উইসকনসিন—এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোতে মোট হিসেবে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ৩০ শতাংশ।
ভোট দেওয়া তরুণদের অনেকের কাছেই এই নির্বাচন ছিল ব্যক্তিগত। মিয়ামির ২৬ বছর বয়সী শিল্পী মোটিকো মোরালেস বলেন, তাঁর শ্রমিক শ্রেণির অভিবাসী এলাকায় পরিবারগুলো বাইরে যেতে, কাজে যেতে বা সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে ভয় পায়। নাগরিকত্বের বৈধ পথের ওপর হামলা ও তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের হুমকি তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে জানান তিনি।
টেক্সাসের রিও গ্রান্ডে সিটির ২২ বছর বয়সী সদ্য স্নাতক ও কমিউনিটি সংগঠক আমান্ডা চাপা বলেন, জীবনে প্রথমবার তিনি এমন একজন প্রার্থীকে দেখেছেন যিনি তাঁর মতো দেখতে এবং রিও গ্রান্ডে ভ্যালির তাঁর মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেন। গভর্নর নির্বাচিত জিনা হিনোহোসা ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের ৭৭ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্প টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের স্টার কাউন্টিকে ৭০ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন, এবার ভোটাররা ৭০ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে তা ফিরিয়ে নিয়েছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ২৬ বছর বয়সী আইনের ছাত্রী সারাহ জন বলেন, তিনি ডেমোক্র্যাটদের সমালোচক হলেও লস অ্যাঞ্জেলেসে ট্রাম্পের আইস অভিযানের প্রভাব দেখে মনে করেন, রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে তাঁর ভোট পার্থক্য গড়ে দেবে। বৃহস্পতিবার লস অ্যাঞ্জেলেস তাদের প্রথম গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক মেয়র নিথিয়া রমনকে নির্বাচিত করেছে। এর ফলে দেশের তিন বৃহত্তম শহরের দুটি এখন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিকদের হাতে।
পোর্টল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী প্যাট্রিক শ্র্যাংক একটি স্বাধীন সিনেমা হল পরিচালনা করেন। তিনি নিজেকে এখন স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেন এবং স্থানীয় ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) শাখায় সক্রিয়। মঙ্গলবার রাতে তিনি পোর্টল্যান্ড ডিএসএর নির্বাচনী রাতের অনুষ্ঠানে তাঁদের তিন সিটি কাউন্সিলরের পুনর্নির্বাচন উদযাপন করেন। বোস্টনের ২৪ বছর বয়সী যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষক জর্ডান করগুড বলেন, ভোট দেওয়াই ছিল নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত থাকার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও সরাসরি উপায়।
তরুণ ভোটারদের এই বদলের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জয়ে তরুণদের আংশিক কৃতিত্ব দেওয়া হলেও যোগ্য তরুণ ভোটারদের অর্ধেকের সামান্য কম ভোট দিয়েছিলেন, যা ২০২০ সালের ৫০ শতাংশ উপস্থিতির চেয়ে কম ছিল। গাজায় ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন এবং প্রতিবাদকারী হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
এক বছর পর চিত্র বদলে গেছে। নিউইয়র্ক সিটির ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের ৭৫ শতাংশ গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক জোহরান মামদানিকে মেয়র হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রগ্রেসিভ ক্যাম্পাস কর্মসূচি মোর পারফেক্ট ইউনিভার্সিটি পরিচালনা করা ২৬ বছর বয়সী এলিস জোশি বলেন, তরুণরা সক্রিয়, তাঁরা ওয়াশিংটনের কর্পোরেট লোভ ও দুর্নীতিতে বিরক্ত এবং সব উপায়ে রাজনীতিতে যুক্ত হতে প্রস্তুত।
বড় জয় পাওয়া অনেক প্রার্থী নিজেরাই তরুণ। কলোরাডোর নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য ২৯ বছর বয়সী মেলাত কিরোস ১৫ মেয়াদের একজন ক্ষমতাসীনকে হারিয়েছেন। প্রভিডেন্স, রোড আইল্যান্ড, তাদের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র হিসেবে ২৮ বছর বয়সী ডেভিড মোরালেসকে নির্বাচিত করেছে। একই দিনে শহরটি ‘গণহত্যায় জড়িত কোম্পানিগুলো’ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পক্ষে ভোট দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর হয়ে ওঠে।
তরুণ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অর্থনীতি ও চাকরি, যা অর্ধেকের বেশি তরুণ ভোটার শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর ছিল স্বাস্থ্যসেবা, ইরান, অভিবাসন, শিক্ষা ও জলবায়ু।



