ঘুমের অভ্যাসেই লুকিয়ে বিষণ্ণতার নতুন ধরনের ইঙ্গিত, বলছে গবেষণা

মানুষের ঘুমের অভ্যাস দেখেই বিষণ্ণতার একটি নতুন ধরন শনাক্ত করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির ছন্দে গোলমালের সঙ্গে যুক্ত এই ধরনটির নাম দেওয়া হয়েছে 'সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন'। গবেষকদের দাবি, ঘুম-জাগরণের ছন্দের বৈশিষ্ট্য দেখে এই ধরনটি চেনা গেলে বিষণ্ণতার রোগীদের জন্য আরও ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার পথ খুলতে পারে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় ও কিউআইএমআর বার্গহোফার মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহ-লেখকেরাও এতে যুক্ত ছিলেন। গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন বিষণ্ণতার ইতিহাস থাকা ১১ হাজার ৩৮০ জন অস্ট্রেলীয় প্রাপ্তবয়স্ক।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ গবেষকদের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছেন। তাঁদের ঘুমের অভ্যাস ও শরীরের অভ্যন্তরীণ ছন্দের যে বৈশিষ্ট্যগুলো মিলেছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই এই নতুন ধরনটির প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকেরা ছয়টি বৈশিষ্ট্যের তালিকা ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে অন্তত তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকলে একজনকে এই ধরনের আওতায় ধরা হয়েছে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: রাত জাগা বা সন্ধ্যার পর বেশি সক্রিয় থাকা, ঘুম থেকে উঠে খুব ক্লান্ত বোধ করা, বিষণ্ণতার সবচেয়ে খারাপ সময়ে বেশি ঘুমানো, ঋতুভেদে পরিবর্তন দেখা দেওয়া, ঘুমিয়ে পড়া ও জেগে ওঠার মাঝের সময়টি দেরিতে হওয়া এবং কর্মদিবস ও ছুটির দিনে ঘুমের সময়ের বড় পার্থক্য, যাকে 'সোশ্যাল জেটল্যাগ' বলা হয়। ঋতুভেদে পরিবর্তনের মধ্যে ঘুম, মেজাজ, কর্মচাঞ্চল্য, ক্ষুধা, ওজন বা শক্তির ওঠানামা থাকতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটি ২০ অক্টোবর 'দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি'তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, এই ফলাফল শেষ পর্যন্ত বিষণ্ণতায় ভোগা রোগীদের আরও ব্যক্তিগতকৃত সেবা দিতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণার প্রথম লেখক, সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেন অ্যান্ড মাইন্ড সেন্টারের এমিলিয়ানা টোনিনি বলেছেন, 'বিষণ্ণতা একরকমের অসুখ নয়, এবং এর বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারলে মানুষকে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা আরও আগেই দেওয়া যায়।' তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই নামটি এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো রোগ নির্ণয় নয়। স্বাধীনভাবে একই ফল আবার পাওয়া এবং আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই সার্কাডিয়ান দলে থাকা মানুষদের বিষণ্ণতা অন্যদের তুলনায় আগেই শুরু হয়েছিল এবং তাঁদের উপসর্গ ছিল আরও গুরুতর। বিষণ্ণতার সময় তাঁদের ওজন বাড়ার ঘটনাও বেশি দেখা গেছে।
ওষুধের ক্ষেত্রেও পার্থক্য ধরা পড়েছে। এই দলের অংশগ্রহণকারীরা দুটি প্রচলিত ধরনের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট — সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটর (এসএসআরআই) ও সেরোটোনিন-নোরএপিনেফ্রিন রিআপটেক ইনহিবিটর (এসএনআরআই) — থেকে তুলনামূলকভাবে কম উপকার পেয়েছেন এবং তাঁদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই জানিয়েছেন তাঁদের ওষুধ কতটা কাজ করেছে। তবে কেন কারও ক্ষেত্রে ওষুধ কম কার্যকর হয়েছে, গবেষণাটি তার কারণ ব্যাখ্যা করেনি। শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঠিক করার লক্ষ্যে কোনো চিকিৎসাও এতে পরীক্ষা করা হয়নি।
গবেষণার সহ-লেখক ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ড. ইয়ান হিকি বলেছেন, এই প্রোফাইল বিষণ্ণতার বিদ্যমান ঐতিহাসিক ধরনগুলোর সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাঁর মতে, এটি সবচেয়ে বেশি মিলে যায় অ্যাটিপিকাল ও বাইপোলার বিষণ্ণতার সঙ্গে, কারণ দুটোতেই কম শক্তি ও বেশি ঘুমের মতো বৈশিষ্ট্য থাকে।
অ্যাটিপিকাল বিষণ্ণতায় ওজন বাড়াও থাকতে পারে। আর বাইপোলার বিষণ্ণতা বলতে বাইপোলার ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের বিষণ্ণতার পর্বকে বোঝায়, যেখানে অস্বাভাবিকভাবে উচ্ছ্বসিত বা খিটখিটে মেজাজ ও বেড়ে যাওয়া শক্তির সময়ও থাকে। হিকি বলেছেন, 'আমরা সার্কাডিয়ান বলতে কেবল ঘুম-জাগরণ ও সার্কাডিয়ান বৈশিষ্ট্যগুলোকেই বুঝিয়েছি।'
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুম-জাগরণের এই গোলমাল কেবল বিষণ্ণতার উপসর্গ নয়, এর অন্তর্নিহিত কারণও হতে পারে বলে হিকি মনে করেন। তবে গবেষণাটি নিজে প্রমাণ করতে পারেনি যে শরীরের ঘড়ির গোলমালই বিষণ্ণতার কারণ, নাকি বিষণ্ণতার ফলেই এই গোলমাল তৈরি হয়।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, রাত জেগে থাকা বা ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হওয়ার অর্থ এই নয় যে কারও বিষণ্ণতা আছে। অংশগ্রহণকারীরা আগেই বিষণ্ণতার কথা জানিয়েছিলেন, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল গুরুতর, বারবার ফিরে আসা বা দীর্ঘস্থায়ী। গবেষণার কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা গবেষকেরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ঘুমের ধরন ও চিকিৎসার অভিজ্ঞতার কথা নিজেরাই জানিয়েছেন, এবং এক সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা এই বিশ্লেষণে বোঝা যায়নি ঘুমের গোলমাল বিষণ্ণতার আগে এসেছে নাকি পরে। সব অংশগ্রহণকারী ছিলেন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত, তাই এই ফল অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নাও খাটতে পারে।
সার্কাডিয়ান দলের অংশগ্রহণকারীরা ম্যানিয়ার মতো অভিজ্ঞতার কথাও বেশি জানিয়েছেন। গবেষণায় যুক্ত না থাকা ফ্লোরিডা আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও মনোচিকিৎসক জন পালস বলেছেন, এই উপসর্গগুলোই হয়তো ব্যাখ্যা করে কেন তাঁদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট কম কাজ করেছে। তাঁর ভাষায়, 'এসএসআরআই বিষণ্ণতার উপসর্গের চেয়ে অনেক বড় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসার জন্য নয়। বরং কিছু এসএসআরআই ম্যানিয়ার উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ঘুম খারাপ করে।'
গবেষণায় যুক্ত না থাকা মেরিল্যান্ডের মনোচিকিৎসক ও মমস ফর মেন্টাল হেলথের প্রতিষ্ঠাতা জিলিয়ান আমোদিও এই ফলকে প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে একইভাবে চিকিৎসার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, জৈবিক, পরিবেশগত, সামাজিক ও মানসিক বিষয়গুলো সবই বিবেচনায় নিতে হবে। রাতের শিফটে কাজ করা মানুষসহ আরও জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করা এবং সময় অঞ্চল ও ঋতুর পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন।
গবেষকেরা বলেছেন, আলোর সংস্পর্শ, নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি এবং মেলাটোনিন-সংক্রান্ত পদ্ধতিগুলো নিয়ে আরও গবেষণা করা উচিত। ঘুমের ছন্দের বৈশিষ্ট্য দেখে বিষণ্ণতার ধরন চেনা গেলে ভবিষ্যতে রোগীদের আরও সঠিক ও ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।




