…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › প্রযুক্তি › খবর
প্রযুক্তি

ডেটা সেন্টারে এত পানি লাগে কেন, আর সেই পানি যায় কোথায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডেটা সেন্টারে এত পানি লাগে কেন, আর সেই পানি যায় কোথায়
ছবি: সংগৃহীত

ডেটা সেন্টার আর পানি যেন এখন সমার্থক শব্দ। ডেটা সেন্টারের কথা উঠলে সেখানে পানির আলোচনা আসবেই। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। কিন্তু আসলেই তো, ডেটা সেন্টার এত পানি দিয়ে করেটা কী?

অনেকেই ভাবেন, গাড়ির ইঞ্জিনের কুল্যান্টের মতো এখানেও হয়তো সারি সারি কম্পিউটারের ভেতর দিয়ে পানি বইতে থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। সার্ভারগুলো কখনোই ভেজে না; ভিজলে তো গল্প ওখানেই শেষ হয়ে যেত! ডেটা সেন্টারের পানি মূলত পাইপের ভেতরেই থাকে এবং এর বেশির ভাগই বাষ্প হয়ে ছাদের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মোট বিদ্যুতের ৪ শতাংশের বেশি এখন ডেটা সেন্টারগুলোই খরচ করে। আর এই বিদ্যুতের প্রায় সবটাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় তাপে। একটি কম্পিউটার চিপ কোনো শক্তি জমিয়ে রাখে না বা সেটিকে গতিতেও রূপান্তর করে না। এটি সেকেন্ডে কোটি কোটি বার অন-অফ হয়, আর প্রতিবার এই কাজের ফলে ভেতরের সিলিকন একটু একটু করে গরম হতে থাকে।

সার্ভারগুলো যাতে গরমে সেদ্ধ না হয়ে যায়, তাই এই তাপ বিল্ডিংয়ের বাইরে বের করতেই হয়। কাজটা হয় দুটি ধাপে। প্রথমে সার্ভার হলের ভেতরের বাতাস বা তরলের সাহায্যে চিপের তাপ শুষে নেওয়া হয়। এটি একটি বদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে একই পানি বা বাতাস বারবার ঘুরতে থাকে এবং কিছুই নষ্ট হয় না।

এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ। এখানেই মূলত পানির হিসাবটা আসতে শুরু করে। বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে তাপ বাইরে বের করার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো কুলিং টাওয়ার। এই টাওয়ার কাজ করে পানি বাষ্পীভূত করার মাধ্যমে।

পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় এত তাপ টেনে নেয় কেন? গরমের দিনে একটু দৌড়াদৌড়ি করলেই আমাদের শরীর ঘেমে যায়। এই ঘাম আমাদের শরীর ভেজানোর জন্য তৈরি হয় না, বরং বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। আর এই বাষ্প হওয়ার সময় ঘাম আমাদের শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ তাপ টেনে নেয়। পানি গরম করলে এর অণুগুলো শুধু একটু দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে। কিন্তু পানি যখন বাষ্প হয়, তখন এর অণুগুলোকে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে বাতাসে উড়ে যেতে হয়। এই কাজে প্রচুর শক্তির দরকার হয়। তাপমাত্রা না বাড়িয়ে তরলকে গ্যাসে পরিণত করার এই শক্তিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘লীন তাপ’ বা ল্যাটেন্ট হিট।

হিসাবটা বেশ দারুণ। এক কেজি পানির তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়াতে লাগে প্রায় ৪২ কিলোজুল শক্তি। কিন্তু ওই একই পরিমাণ পানিকে স্বাভাবিক আরামদায়ক তাপমাত্রায় (প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বাষ্প করতে লাগে প্রায় ২ হাজার ৪৩০ কিলোজুল শক্তি! অর্থাৎ, পানি গরম করার চেয়ে তা বাষ্প করলে প্রায় ৫৮ গুণ বেশি তাপ শুষে নেওয়া যায়।

ডেটা সেন্টারে প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ার (৩,৬০০ কিলোজুল) বিদ্যুতের পুরোটাই তাপে পরিণত হয়। এই তাপ বের করতে কুলিং টাওয়ারে প্রায় দেড় লিটার পানি বাষ্প করতে হয়। বাষ্প না করে শুধু পানি গরম করে তাপ বের করতে গেলে পানির খরচ প্রায় ৬০ গুণ বেড়ে যেত!

ডেটা সেন্টারের কুলিং টাওয়ার কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই বিশাল চিমনিগুলোর মতো নয়। এগুলো সাধারণত চারকোনা বাক্সের মতো হয়। এর ওপরে লাগানো থাকে বড় বড় ফ্যান। এগুলো বিল্ডিংয়ের ছাদে বা পাশের কোনো খোলা জায়গায় বসানো হয়। ভেতরের কাজটা বেশ মজার। সার্ভার থেকে আসা গরম পানি প্লাস্টিকের মৌচাকের মতো একটি কাঠামোর ওপর স্প্রে করা হয়। একই সময়ে ওপরের ফ্যানগুলো বাইরের বাতাস টেনে ওই পানির ওপর দিয়ে প্রবাহিত করে। এতে সামান্য কিছু পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায় এবং বাকি পানিটুকু একদম ঠান্ডা হয়ে যায়। এই ঠান্ডা পানি আবার সার্ভারের তাপ আনতে ফিরে যায়। আর বাষ্পটুকু বেরিয়ে যায় ছাদের ওপর দিয়ে ধোঁয়ার মতো।

এই টাওয়ার মূলত তিনভাবে পানি হারায়—বাষ্পীভবন, ব্লোডাউন এবং ড্রিফট। ফ্যানের বাতাসে উড়ে যাওয়া পানির সামান্য ছিটেফোঁটা হলো ড্রিফট। আসল খরচটা হয় বাষ্পীভবনে, যার জন্যই এই টাওয়ার বানানো। আর ব্লোডাউন একটু লুকিয়ে থাকে! পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় এর ভেতরের খনিজ পদার্থগুলো কিন্তু টাওয়ারেই থেকে যায়। অনেকক্ষণ ফোটানোর পর হাঁড়ির নিচে যেমন লবণ জমে থাকে, অনেকটা তেমন। এগুলো জমতে দিলে খনিজ পদার্থ জমে পাইপ জ্যাম হয়ে যাবে। তাই টাওয়ারটি মাঝেমধ্যেই এই লবণাক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন পরিষ্কার পানি টেনে নেয়।

এখান থেকেই পানির হিসাবের দুটি আলাদা শব্দ এসেছে, যা অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। একটা হলো উইথড্রয়াল, অন্যটি কনজাম্পশন। যে পরিমাণ পানি ডেটা সেন্টার টেনে নেয়, সেটা উইথড্রয়াল। আর কনজাম্পশন মানে পানির যে অংশটুকু বাষ্প হয়ে যায়। ভালো মানের পানি হলে টেনে নেওয়া পানির প্রায় ৮০ শতাংশই বাষ্প হয়, বাকিটা ব্লোডাউন হিসেবে ড্রেনে চলে যায়। বাস্তব চিত্রে এই হিসাব একেক জায়গায় একেক রকম। কোনো কোনো বড় ক্লাউড কোম্পানির প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ারে মাত্র ১ লিটার পানি লাগে। কারণ বছরের অনেকটা সময় তারা বাইরের ঠান্ডা বাতাস ব্যবহার করে। আবার অ্যারিজোনার মতো মরুভূমি এলাকায় গরমের দিনে তা ৯ লিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কারণ, গরম আর শুষ্ক বাতাসের কারণে টাওয়ারের অনেক বেশি খাটতে হয়।

আবহাওয়া ভালো থাকলে অনেক ডেটা সেন্টার শুধু বাইরের বাতাস দিয়েই সার্ভার ঠান্ডা করে। তবে এখানে একটা ছোট্ট বাধা আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ওয়েট-বাল্ব টেম্পারেচার’। একটি কুলিং টাওয়ার পানিকে এই ওয়েট-বাল্ব টেম্পারেচার পর্যন্ত ঠান্ডা করতে পারে। কিন্তু পানি ছাড়া শুধু রেডিয়েটর আর ফ্যান চালালে তা বড়জোর বাইরের বাতাসের তাপমাত্রার সমান ঠান্ডা হতে পারবে। এ কারণেই সাধারণ ‘ফ্রি এয়ার’ বাতাসনির্ভর ডেটা সেন্টারগুলোও বাইরের তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হলেই পানি বাষ্প করার পদ্ধতি চালু করে দেয়।

ডেটা সেন্টারের পানি খরচের হিসাব মাপা হয় ‘ওয়াটার ইউসেজ ইফেক্টিভনেস’ দিয়ে। এর মানে হলো প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ার বিদ্যুতের জন্য কত লিটার পানি বাষ্প হচ্ছে। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব করলে ডেটা সেন্টারগুলো প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ারে গড়ে তিন ভাগের এক লিটারের সামান্য বেশি পানি খরচ করে। হিসাব কষলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলো মোট ৬৬ বিলিয়ন লিটার (৬ হাজার ৬০০ কোটি লিটার) পানি বাষ্প করেছে, যা দশ বছর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ! বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলোর ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই পানির খরচও হু হু করে বাড়ছে।

এবার আসা যাক আসল বিতর্কে। ডেটা সেন্টারে যে পানি বাষ্প হয়, তা আসলে মোট খরচের খুব ছোট একটা অংশ। বিদ্যুৎ তো কোথাও না কোথাও থেকে আসতে হবে, আর বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রই হলো বিশাল আকৃতির পানির কেটলি! এগুলো পানি ফুটিয়ে বাষ্প করে টারবাইন ঘোরায় এবং সেই বাষ্প ঠান্ডা করতে নিজেদের কুলিং টাওয়ারে আরও পানি খরচ করে। এই পরোক্ষ হিসাবটা জুড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে মোট পানির খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৮০০ বিলিয়ন লিটার! অর্থাৎ, ডেটা সেন্টার যে পরিমাণ পানি খরচ করে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তার চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি পানি বাষ্প করে আকাশে উড়িয়ে দেয়।

চ্যাটবট বা এআই পানি নষ্ট করে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরও এখানেই লুকিয়ে আছে। পুরোনো মডেল জিপিটি-৩-এর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ১০ থেকে ৫০টি মাঝারি সাইজের উত্তরের জন্য একটি হাফ লিটার বোতলের সমান পানি খরচ করে। তবে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর বিভাজনটা। এই আধা লিটারের মধ্যে ডেটা সেন্টারে খরচ হয় মাত্র ২ মিলিলিটারের মতো, আর বাকি প্রায় ১৫ মিলিলিটার পানি বাষ্প হয় ওই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে!

পানি ব্যবহার না করে কি ডেটা সেন্টারগুলো চলতে পারবে? ডেটা সেন্টারগুলো এত পানি ব্যবহার করে কারণ এগুলো প্রচুর তাপ তৈরি করে। আর পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে এই তাপ সরানোর সবচেয়ে সস্তা উপায় হলো পানির বাষ্পীভবন। পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শুধু গরম হওয়ার চেয়ে ৫৮ গুণ বেশি তাপ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। অবশ্য এসির মতো যন্ত্র দিয়েও ঠান্ডা করা যায়। এটি যেকোনো আবহাওয়ায় কাজ করে এবং কোনো পানি খরচ করে না। কিন্তু এর জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে, আর সেই বিদ্যুৎ তৈরি করতে গিয়ে আবার পানিই খরচ হয়!

প্রযুক্তি বিভাগের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপেই গরুর খামার নিয়ন্ত্রণ, নওগাঁয় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পশুপালন
প্রযুক্তি

মোবাইল অ্যাপেই গরুর খামার নিয়ন্ত্রণ, নওগাঁয় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পশুপালন

সনাতন পদ্ধতির খামার ব্যবস্থাপনা ছেড়ে আধুনিক প্রযুক্তির পথে হাঁটছেন নওগাঁর খামারিরা। এখন মোবাইল ফোনের একটি অ্যাপের মাধ্যমেই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যা…

প্রযুক্তি

চীনা গুপ্তচরের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে কংগ্রেসের প্রশ্নের মুখে এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াংয়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা এক নারী চীনের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করতেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গো…

পরম শূন্যের কাছাকাছি ঠান্ডা তামার টুকরো ঘরে রাখলে কী ঘটবে?
প্রযুক্তি

পরম শূন্যের কাছাকাছি ঠান্ডা তামার টুকরো ঘরে রাখলে কী ঘটবে?

ধরুন, কোনো এক শীতের সকালে আপনি রান্নাঘরে ঢুকলেন। টেবিলের ওপর রাখা আছে এক টুকরো তামা। দেখতে আর দশটা তামার টুকরোর মতোই। কিন্তু এর তাপমাত্রা পরম শূন্যের …

টেক্সাস কারখানায় সাইবারট্রাক উৎপাদন গুটিয়ে নিচ্ছে টেসলা, জায়গা ছাড়া হবে সাইবারক্যাবের জন্য
প্রযুক্তি

টেক্সাস কারখানায় সাইবারট্রাক উৎপাদন গুটিয়ে নিচ্ছে টেসলা, জায়গা ছাড়া হবে সাইবারক্যাবের জন্য

টেসলা আগামী বছর টেক্সাসের কারখানায় সাইবারট্রাক গাড়ির উৎপাদন গুটিয়ে নেবে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির প্রধান ইলন মাস্ক।…