পরম শূন্যের কাছাকাছি ঠান্ডা তামার টুকরো ঘরে রাখলে কী ঘটবে?

ধরুন, কোনো এক শীতের সকালে আপনি রান্নাঘরে ঢুকলেন। টেবিলের ওপর রাখা আছে এক টুকরো তামা। দেখতে আর দশটা তামার টুকরোর মতোই। কিন্তু এর তাপমাত্রা পরম শূন্যের মাত্র কয়েক ডিগ্রি ওপরে, অর্থাৎ প্রায় মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবার সেটি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে দিলেন। কী ঘটবে তখন?
হয়তো ভাবছেন, তামার টুকরোটির চারপাশে মুহূর্তেই বরফ জমতে শুরু করবে। জানালার কাচ ঢেকে যাবে সাদা কুয়াশায়। একটু পর পুরো ঘরটাই বরফে জমে যাবে, একদম মুভির মতো। কিন্তু বাস্তবে এমনটা কখনোই ঘটবে না। বরং এর ঠিক উল্টোটা ঘটবে।
তামার টুকরোটি আশপাশের পরিবেশ থেকে তাপ শুষে নিতে শুরু করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এর তাপমাত্রা ঘরের তাপমাত্রার কাছাকাছি হয়।
শীতের সকালে দুই হাত একসঙ্গে ঘষে দেখেছেন নিশ্চয়ই। কিছুক্ষণ ঘষলেই হাত গরম হয়ে যায়। কিন্তু হাতের মধ্যে তো বাইরে থেকে কোনো আগুন কিংবা গরম পানি ঢোকানো হয়নি। তাহলে হাত গরম হলো কীভাবে?
আসলে দুই হাত ঘষার সময় ঘর্ষণের কারণে যান্ত্রিক শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়। ফলে হাতের ভেতরের অণু-পরমাণুর এলোমেলো গতির শক্তি বেড়ে যায়। এ জন্যই আমাদের হাত গরম হয়ে যায়।
কোনো পদার্থের তাপমাত্রা তার ভেতরের কণাগুলোর তাপীয় গতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণভাবে তাপমাত্রা যত বেশি, কণাগুলোর এলোমেলো গতির শক্তিও তত বেশি থাকে। যেমন, গরম কফির পানির অণুগুলোর তাপীয় গতি ঠান্ডা কফির পানির অণুগুলোর তুলনায় বেশি।
এবার প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। ভাবুন, কোনো বস্তুর তাপমাত্রা কমতে কমতে যদি একেবারে সর্বনিম্ন সীমায় পৌঁছে যায়, তাহলে কী হবে? তাপমাত্রার সর্বনিম্ন সীমার নাম পরম শূন্য তাপমাত্রা। এর মান ০ কেলভিন, অর্থাৎ মাইনাস ২৭৩ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এবার ফিরে আসা যাক রান্নাঘরের টেবিলে রাখা তামার টুকরোটির কাছে। ধরা যাক, তরল হিলিয়াম দিয়ে ঠান্ডা করা এক টুকরো তামার তাপমাত্রা প্রায় ৪ কেলভিন। সেটি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখা হলো। প্রথমেই টেবিলের সংস্পর্শে থাকা অংশ দিয়ে তাপ তামার মধ্যে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে আশপাশের বাতাস থেকেও তাপ পাবে বস্তুটি।
ঘরের বাতাসের তাপমাত্রা যদি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তাহলে তামার টুকরোটি আর ঘরের মধ্যে তাপমাত্রার বিশাল পার্থক্য থাকবে। এই পার্থক্যের কারণে প্রথম দিকে তাপ প্রবাহের হার বেশি হতে পারে। তামার তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পার্থক্য কমতে থাকবে।
তবে তামার টুকরোটি ঘরে রাখলেই পুরো ঘর বরফে জমে যাবে না। বরং তামার আশপাশের বাতাস সামান্য ঠান্ডা হতে পারে। সেটিও নির্ভর করবে তামার টুকরোটির আকার, ভর, ঘরের আকার এবং চারপাশ থেকে কত দ্রুত তাপ আসছে, তার ওপর।
আরেকটি বিষয় ঘটতে পারে। তামার অত্যন্ত ঠান্ডা পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এলে বাতাসের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে পানি বা বরফে পরিণত হতে পারে। তাপমাত্রা যথেষ্ট কম থাকলে পৃষ্ঠে বরফ জমতে পারে। তাই টুকরোটির গায়ে সাদা আস্তরণ দেখা গেলেও সেটি এমন কোনো হিমশীতল রশ্মি ছড়ানোর প্রমাণ নয়, বরং বাতাসের জলীয় বাষ্প জমে যাওয়ার ফল হতে পারে।
এত কম তাপমাত্রা শুধু কৌতূহল মেটানোর জন্য তৈরি করা হয় না। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কথা বলা যায়। কিছু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে অতিপরিবাহী বর্তনী বা সার্কিট ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে খুবই কম তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যাতে তাপীয় গোলযোগ কমে এবং কিউবিটগুলো নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম অবস্থা ধরে রাখতে পারে।
এ জন্য বিশেষ হিমায়নযন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা তাপমাত্রা কয়েক মিলিকেলভিন পর্যন্ত নামিয়ে আনতে পারে। এই তাপমাত্রা মহাকাশের গড় পটভূমি তাপমাত্রা, প্রায় ২ দশমিক ৭ কেলভিনের চেয়েও অনেক কম।




