মিরপুরে যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে নির্যাতনের দাবি ভুয়া, ছবিতে এআইয়ের ব্যবহার পেল যাচাই

ঢাকার মিরপুরে বাসায় ঢুকে যুব মহিলা লীগের এক নেত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে—এক নারীর পিঠে আঘাতের চিহ্ন থাকা একটি ছবি দিয়ে ফেসবুক ও এক্সে এমন দাবি ছড়িয়েছে। অর্ধশতাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই প্রচার চালানো হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিনভর ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে বলা হয়েছে, ওই নারী থানায় অভিযোগ জানাতে গেছেন এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার একটি বর্ণনাও পোস্টগুলোতে রয়েছে। তবে ঘটনাটি কবে ঘটেছে, তার কোনো উল্লেখ পোস্টগুলোতে নেই।
যাচাইয়ে ছবিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এমন কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। যে পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে, সেটার অস্তিত্বও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ছবিটি পোস্ট করেছেন এমন তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। যে নারীকে নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের উপায়, তাঁর ঠিকানা এবং থানায় দেওয়া অভিযোগের অনুলিপি তিনজনের কাছেই চাওয়া হয়েছিল। কেউই তা দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁরা জানিয়েছেন, অন্যের পোস্ট কপি করে নিজেদের অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন এবং ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না।
ফেসবুক ও এক্সের পোস্টগুলোতে এক ব্যক্তির পিঠের ছবি দিয়ে বলা হয়েছে, তাঁর নাম ‘শ্রীময়ী রীতা রানী’। তাঁকে মিরপুর থানা যুব মহিলা লীগের ‘সংগঠক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, তিনি হিন্দু, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন এবং দেখতে সুন্দরী—এসব কারণে তাঁর বাসায় ঢুকে তাঁকে ‘পাশবিক নির্যাতন’ করা হয় এবং মারধরে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়।
কিছু পোস্টে ফিরোজ নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের জন্য দায়ী করা হয়েছে। তবে তাঁর পরিচয় নিয়ে পোস্টগুলোর বর্ণনায় অমিল আছে। কোথাও বলা হয়েছে, মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের নির্দেশে ফিরোজ ওই নারীর বাসায় ঢোকেন। আবার কোথাও ফিরোজকেই থানা কমিটির আহ্বায়ক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে।
পোস্টদাতাদের আরও দাবি, ওই নারী মিরপুর থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওসি তাঁকে বলেন, তাঁর সৌন্দর্যই তাঁর ‘কাল’ এবং ওসি তাঁকে বোরকা পরার পরামর্শও দেন। এসব অভিযোগ তুলে পোস্টগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং নারীবাদীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
এ-সংক্রান্ত অর্ধশতাধিক পোস্ট যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে শুক্রবার বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটে ‘এফ কে জয় জয়’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পোস্ট করার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ‘মুকুল আহমেদ’ ও ‘সুমন মল্লিক’ নামের আরও দুটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও একই দাবিতে ছবিটি পোস্ট করা হয়। প্রোফাইলগুলোর আগের পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেগুলো থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া হয়।
বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন নিজের ফেসবুক পেজে ছবিটি পোস্ট করেন। রাত আটটা পর্যন্ত তাঁর পোস্টে প্রায় চার হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে। এক্সেও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে ছবিটি ছড়ানো হয়। এর মধ্যে ‘Dr Baidyanath Ghosh’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্ট রাত নয়টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার বার দেখা হয়েছে।
ছবিটি যাচাইয়ে তিনটি টুল ব্যবহার করা হয়—সিন্থআইডি, ওপেনএআইয়ের এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট যাচাইয়ের টুল ও হাইভ মডারেশন। যাচাইয়ে ছবিটি তৈরিতে এআই ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে পুরো ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি, নাকি আগের কোনো ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে, যাচাইয়ের ফলাফলে তা স্পষ্ট নয়।
ছবিটির সূত্র খুঁজতে গিয়ে প্রায় এক মাস আগের কয়েকটি অনলাইন পোস্ট পাওয়া যায়। সেসব পোস্টে ভারতের কেরালায় যৌতুকের দাবিতে এক নববধূকে তাঁর স্বামীর নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে একটি ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। মিরপুরে নির্যাতনের দাবিতে ছড়ানো ছবিটির সঙ্গে ওই ছবির কিছুটা মিল আছে। তবে কেরালার ঘটনার সঙ্গে ছড়ানো ছবিটি সম্পাদনা করেই পরেরটি তৈরি করা হয়েছে কি না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অনলাইন প্রচারণায় ওই নারীর দলীয় পরিচয় নিয়েও অসংগতি পাওয়া গেছে। তাঁকে ‘মিরপুর থানা যুব মহিলা লীগের সংগঠক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। যুব মহিলা লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংগঠনটিতে ‘সংগঠক’ নামে কোনো পদ নেই।
মিরপুর থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান সন্ধ্যায় বলেছেন, তাঁর থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং এমন অভিযোগ নিয়েও কোনো নারী থানায় আসেননি। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেছেন, তাঁর বিভাগের অধীন কোনো থানা এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি এবং পোস্টে যে নারীর কথা বলা হয়েছে, এমন নামে বা তাঁর পক্ষে কেউ মিরপুর বিভাগের কোনো থানায় মামলা বা অভিযোগ করতেও আসেননি।
পোস্টে অভিযোগের বিষয়ে মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ফিরোজ আহমেদ বলেছেন, এমন কোনো বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না, ওই নারীকে চেনেনও না। তিনি বলেছেন, এলাকায় এমন নামে কেউ আছেন এবং তিনি যুব মহিলা লীগ করেন—এমনও তিনি শোনেননি, কেউ বলতেও পারছেন না। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাও তাঁকে ফোন দিয়েছেন। ফিরোজ আহমেদ আরও বলেন, একেক জায়গায় তাঁর পরিচয় একেকভাবে দেওয়া হয়েছে, এটি একেবারেই উড়ো একটি খবর, সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক, এবং তিনিও চান প্রকৃত ঘটনার উদ্ঘাটন হোক।




