চীনে ফেরত পাঠালে 'দাসের মতো' থাকতে হবে, বলছেন থাইল্যান্ডে আটক উইঘুররা

থাইল্যান্ড থেকে চীনে ফেরত পাঠানো হলে দুই উইঘুর পুরুষের জীবন গুরুতর বিপদে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের একজন বলেছেন, চীনে ফেরত পাঠানো হলে তিনি দাসের মতো থাকবেন।
গত বছর থাই কর্তৃপক্ষ ওই ব্যক্তিদের নিজেদের এবং জাতিসংঘের অনুরোধ উপেক্ষা করে ৪০ জন উইঘুর পুরুষকে জোর করে চীনে ফেরত পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা তাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানা গেছে, তবে ব্যাংকক বেইজিংকে অসন্তুষ্ট করতে চায়নি বলে মনে হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের অবস্থান এখনো অজানা।
এখন আরও দুজন একই পরিণতির আশঙ্কা করছেন। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি তাদের অভিবাসন আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে, থাই কর্তৃপক্ষ আবারও বেইজিংয়ের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে পারে।
দুজনের একজনের বান্ধবী জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করা তার প্রেমিক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তিনি চীন ছাড়া আর যেকোনো জায়গায় যেতে চান।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন ওই দুজনকে নিরাপদ তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগের থাই সরকারগুলো উইঘুরদের বছরের পর বছর অমানবিক আটকাবস্থায় রেখেছিল এবং পরে বেইজিংয়ের দাবি মেনে তাদের চীনে পাঠিয়েছিল, যেখানে তাদের জোর করে গুম করা হয়।
ওই দুজন ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টার সঙ্গে জড়িত অপরাধে সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। তারা ২০০ জনের বেশি উইঘুর নারী, পুরুষ ও শিশুর একটি দলের অংশ ছিলেন, যাদের ২০১৪ সালে চীন থেকে পালিয়ে আসার পর মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছে থাই পুলিশ আটক করে।
২০১৪ সালের পর থেকে ওই দলের নারী ও শিশুদের তুরস্কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আর পুরুষদের আলাদা আলাদা দলে চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে জাতিসংঘ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচনা করেছেন।
উইঘুররা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের প্রধানত তুর্কি মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। তারা চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দশকের পর দশক ধরে নিপীড়নমূলক ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার লক্ষ্যে পরিচালিত আটক শিবিরে লাখ লাখ মানুষকে বন্দি করা হয়েছে।
জাতিসংঘ বেইজিংয়ের এই দমনপীড়নকে মানবতার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধ হিসেবে নিন্দা করেছে। তবে বেইজিং তাদের জিনজিয়াং নীতিকে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্যে পরিচালিত বলে দাবি করে আসছে।
জুলাই মাসে মারজিয়া কাসেমের প্রেমিক তাকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, চীনে ফেরত পাঠানো হলে তিনি দাসের মতো থাকবেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন কেন তিনি মানুষ, চীনের বিরুদ্ধে তিনি কী ভুল করেছেন, তিনি চীনে ফিরতে চান না। কাসেম চিঠিটি একটি থাই মানবাধিকার গোষ্ঠীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।
বুধবার ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে থাকা দুজন থাইল্যান্ডের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে নিজেদের আবেদন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
উইঘুরদের স্বজনরা বলেছেন, চীনা সরকার উইঘুরদের বড় দলে নিরাপদ কোনো দেশে গিয়ে একসঙ্গে বসবাস করা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং তাদের ফেরত পাঠাতেই বেশি আগ্রহী।
দুজনের বিরুদ্ধে চীন আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান চাইপ্রুয়াক দোংপ্রাপাত সাংবাদিকদের বলেছেন, ওই দুজনের পাশাপাশি কারাগারে থাকা আরও তিন উইঘুরের বিরুদ্ধে চীনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
কেউ কেউ এই পরোয়ানার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ তাদের অন্তত একজন, কাসেমের প্রেমিক, চীন ছাড়ার সময় নাবালক ছিলেন। কাসেম প্রশ্ন তুলেছেন, চীন যদি সত্যিই তাদের কোনো অপরাধের জন্য খুঁজে থাকে, তাহলে ২০১৪ সালে আটক হওয়ার সময়ই কেন ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করেনি।
কাসেম মনে করেন, গত বছরের গণহারে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় থাইল্যান্ড সমালোচিত হওয়ায় এবার কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপের জন্য আরও বিশ্বাসযোগ্য আইনি ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, চোরাচালানের মতো আন্তঃসীমান্ত অবৈধ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় চীন ও থাইল্যান্ডের সহযোগিতা দুই দেশের আইন, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।




