পোশাকশিল্পে নাশকতার ছায়া, ৯০ দিন বন্ধ থাকলে ভেঙে পড়বে অর্থনীতি: সতর্ক করলেন অর্থনীতিবিদরা

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিযোগ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তে শিল্পাঞ্চলে পরিকল্পিত নাশকতার নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে বলে জানা গেছে।
উদ্যোক্তারা কারখানা গড়ে তোলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য, নীতির ধারাবাহিকতা এবং অভিন্ন জাতীয় লক্ষ্যই একটি দেশকে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করে। পরিণত অর্থনীতির দেশগুলোতে কারখানার ফটক পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রাজনৈতিক বিরোধ থেমে যায়।
কিন্তু বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগজনক এক বাস্তবতার মুখোমুখি। এখানে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ তৈরি পোশাক খাতকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হতে দেখা যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি অভিযোগ করেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় বৈরী শক্তি পোশাকশ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে। রাষ্ট্রকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করা এবং অর্থনীতিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তারা শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা পরিকল্পিত নাশকতার একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা এবং পুলিশের দুই সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে অর্থায়ন এবং উসকানি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া কর্মসূচিটি ছিনতাই করে কৌশলগত সহিংসতা ও নাশকতার ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। মিরপুরে ৩ নভেম্বর এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে বিষয়টি পুরোপুরি সামনে এসেছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে যখন অস্থিরতার ধোঁয়া উঠছে, তখন এই রাজনৈতিক খেলার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বিরল এক ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে।
দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানা রয়েছে এমন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ ছায়ার আড়ালে কলকাঠি নাড়ানো ব্যক্তিদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বহিরাগত রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিকে কেউ ছিনতাই করতে পারবে না।
শিবু মার্কেট ও কাঠারপুল এলাকায় উত্তেজনার মধ্যে অবস্থান নিয়ে নজরুল ইসলাম আজাদ জাতীয় সড়ক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বিক্ষোভের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি দেশকে স্মরণ করিয়ে দেন, সরকার ও কারখানার মালিকেরা ন্যায্য মজুরির অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেও একটি অদৃশ্য শক্তি সেই আন্দোলনকে জাতীয় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দলীয় রাজনৈতিক সংঘাত থেকে এই শিল্প খাতকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার পরিণতি সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহ। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ ছাড়া দেশের মোট জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। রাজনৈতিক নাশকতার কারণে মাত্র ৯০ দিনের জন্যও যদি এই শিল্পের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, তিন মাসের জন্য কার্যক্রম বন্ধ থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কমে যাবে, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির সক্ষমতা হারাবে দেশ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে টাকার মান দ্রুত পড়ে যাবে।
হিসাব-নিকাশের বাইরেও এর পেছনে রয়েছে বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। ৯০ দিনের জন্য কারখানা বন্ধ থাকলে সরাসরি ৪০ লাখের বেশি শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে, যাঁদের অধিকাংশই নারী। পাশাপাশি তাঁদের ওপর নির্ভরশীল ২ কোটির বেশি পরিবারের সদস্য তীব্র খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্যের মুখে পড়বেন। এর ফলে মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্বের ফ্যাশন বাজার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর জন্য অপেক্ষা করবে না। একটি মৌসুমের অর্ডার সরবরাহে ব্যর্থ হলেই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্থায়ীভাবে ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নিতে পারে। এতে এমন ক্ষত তৈরি হবে, যা সারিয়ে তুলতে এক দশক লেগে যেতে পারে।
একই সময়ে এসব কারখানার সঙ্গে বিশাল ঋণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাঠামোগতভাবে যুক্ত দেশের ব্যাংকিং খাতও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বড় করপোরেট ঋণখেলাপির ঘটনা বাড়বে, আটকে যাবে তারল্য এবং পুরো বেসরকারি অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে।
তিন মাসের উৎপাদন বন্ধ থাকা কোনো সাময়িক বিরতি নয়; এটি কয়েক দশকের দারিদ্র্য বিমোচন ও শিল্পোন্নয়নের অর্জনকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার শামিল। শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের নবগঠিত মজুরি কমিশন কাজ শুরু করার সময় দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষের কাছ থেকে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের দাবি উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি ও বিদেশের যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব যখন এমনিতেই নানা সংকটের মুখে, তখন পোশাকশিল্পকে রাজনীতির বাইরে রাখা আর কোনো বিকল্প নয়। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এটাই এখন শেষ প্রতিরক্ষাপ্রাচীর।



