ফ্রিজে আগুনের ঝুঁকি, ভুয়া পারমাণবিক সতর্কতা আর ৬০০ কোটি ডলারের চুরি—হ্যাকিং মহামারির দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব?

লন্ডনের এক ফল ও সবজির পাইকারি ব্যবসায়ী অ্যালেক্স পিয়ার্স গত সপ্তাহের সোমবার সকালে দোকানে ঘুরতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু লক্ষ্য করলেন। তাঁর একটি রেফ্রিজারেশন ইউনিটের ডিফ্রস্ট বাতি জ্বলছে, আর প্যানেলের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চতুর্থ ইউনিটেও একই অবস্থা। সবচেয়ে বড় ইউনিটের কাছেও গিয়ে তিনি দেখলেন, সেখানেও ডিফ্রস্ট বাতি জ্বলছে।
তখনই তাঁর মনে হলো—এটা কি সাইবার হামলা? তিনি ইউনিটগুলোকে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করা বাক্সের কাছে গিয়ে তারটি টেনে খুলে দিলেন।
একই দিনে বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের খুচরা বিক্রেতারাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। কিছু দোকানের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
পিয়ার্স বলেন, 'শনিবার সকালে এমনটা ঘটলে, যখন আমি সাধারণত এখানে থাকি না, শেষ পর্যন্ত আগুনও লাগতে পারত।'
তবে শুধু পিয়ার্স কিংবা ওই খুচরা বিক্রেতারাই নয়, ফ্রান্সের রক্ত ব্যাংকগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে এটি ছিল তিনটি হামলার একটি।
৩০ অক্টোবর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইনান্স থেকে চুরি হয় ৬৩০ কোটি ডলার (৪৭০ কোটি পাউন্ড)—রেকর্ড পরিমাণ চুরি। আর ১ নভেম্বর হ্যাকাররা ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে হামলা চালিয়ে কিয়েভের মানুষের কাছে ভুয়া পারমাণবিক হামলার সতর্কতা পাঠায়।
ফ্রিজ হামলার পর আনুষ্ঠানিক বার্তা হলো—আরও বিঘ্নের আশা করা যায়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের (এনসিএসসি) প্রধান রিচার্ড হর্ন বলেন, আমরা নতুন হ্যাকিং পরিস্থিতির 'পাদদেশে' রয়েছি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আইটি ব্যবস্থার ত্রুটি উন্মোচন করছে—এ প্রসঙ্গে হর্ন বলেন, 'বাইরে এত ত্রুটি রয়েছে যে... বলা যায় সেগুলো কাজে লাগানোর অপেক্ষায় আছে।' তিনি আরও বলেন, 'স্বল্প মেয়াদে আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি হলো ঘটনার সংখ্যায় বিশাল বৃদ্ধি... গত কয়েক মাসের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, আমরা তা দেখতে শুরু করেছি।'
গত মাসে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের এআই প্রযুক্তি পিএইচপি—যে কম্পিউটার ভাষায় বিশ্বের ওয়েবের বড় অংশ তৈরি—তাতে একটি ত্রুটি খুঁজে পাওয়ার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফ্রান্সের সুপারমার্কেটের ফ্রিজেও গত মাসে হামলা হয়েছিল, যা এই সপ্তাহের বড় হামলার মহড়া হতে পারে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ভাষ্যকার আজিম আজহার বলেন, এআই মডেলগুলো যেভাবে ত্রুটি খুঁজে বের করছে, তা তাঁকে চীনের কোভিড শুরুর কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি একে 'উহান মুহূর্ত' বলে আখ্যা দেন। সাইবার নিরাপত্তা নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স গত মাসে বলেছিলেন, 'আগামী কয়েক বছর প্রতি সপ্তাহেই মনে হবে আকাশ ভেঙে পড়ছে।'
এনসিএসসির সতর্কতার পেছনে দুটি কারণ—ভূরাজনীতি ও এআই। অন্তত একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ফ্রিজ হামলায় রাশিয়ার ছাপ রয়েছে, আর বাইনান্স হ্যাকের জন্য উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে। ইউক্রেনের ঘটনায়ও স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়া সন্দেহের তালিকায় রয়েছে।
এনসিএসসি গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে হ্যাকিং হামলায় এআই-চালিত ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহৃত হওয়ার 'অত্যন্ত সম্ভাবনা' রয়েছে। এআই হামলাকারীদের লক্ষ্য খোঁজা, আইটি নেটওয়ার্কের দুর্বলতা নির্ণয় ও ক্ষতিকর কোড লেখায় সাহায্য করবে।
তবে কিছু সতর্কতাও রয়েছে। এনসিএসসির অপারেশন পরিচালক পল চিচেস্টার বলেন, ফ্রিজের ত্রুটি খুঁজতে হ্যাকারদের আসলে এআইয়ের দরকার হয়নি, কারণ সেগুলো আগে থেকেই জানা ছিল—এমনকি একটি ফ্রিজ পরিচালনাকারী কোম্পানির ম্যানুয়ালে ডিফল্ট অ্যাক্সেস পাসওয়ার্ড প্রকাশিত ছিল। শীর্ষ সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোস জানিয়েছে, পিএইচপি ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত তাদের ক্লায়েন্টদের মধ্যে বড় কোনো ঘটনা তারা দেখেনি, যদিও শিল্পের অন্যান্যদের মতো তারাও ওই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রচেষ্টা দেখেছে।
এনসিএসসির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী সিয়ারান মার্টিন 'উহান মুহূর্ত' তুলনাকে খাটো করে দেখেন। তিনি বলেন, এটা প্রথমবার নয়—২০১৭ সালের নটপেটিয়া ও ওয়ানাক্রাই সাইবার হামলা, যেগুলোর জন্য যথাক্রমে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করা হয়, এবং ২০২১ সালে র্যানসমওয়্যার হামলার ঢেউয়ের কথা তিনি উল্লেখ করেন। 'এটা খারাপ সময়, তবে অভূতপূর্ব নয়,' বলেন মার্টিন। 'আমরা প্রতি কয়েক বছর পর পর ঘটা ঘটনার ঢেউয়ের মধ্যে আছি।'


