মুক্তি পেয়েও বন্দি জীবন: পশ্চিম তীরে বারবার গ্রেপ্তার হচ্ছেন সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিরা
পশ্চিম তীরে মুক্তি পাওয়া সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিরা বারবার ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। এতে তাঁদের পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আহমেদ আবেদ (গ্রেপ্তারের হুমকির কারণে ছদ্মনাম) প্রায় দুই বছর আগে ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিরেছেন। তবু তিনি এখনো নিজেকে বন্দি মনে করেন। ৪৩ বছর বয়সী আবেদকে প্রায়ই আবার গ্রেপ্তার করা হয় অথবা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয়।
আবেদ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পান। তিনি যাবজ্জীবন সাজার ২২ বছর ভোগ করেছিলেন। মুক্তির পর থেকে তাঁকে ছয়বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পাঁচবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে। প্রতিবারই তাঁর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে এবং তাঁর পরিবারকে আতঙ্কিত করা হয়েছে।
মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। তাঁরা জানায়, বিনিময় চুক্তি করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তারা খুশি নয় এবং সামান্যতম ভুল করলেই তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হবে বলে সতর্ক করে।
আবেদকে একবার তাঁর বাবার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়, কারণ তিনি রাতে বাড়ির বাইরে ছিলেন। শহরে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতার খবর পেলেই তাঁর পরিবার উচ্চ সতর্কতায় চলে যায়; কেউ সারারাত ঘুমায় না। কিছু প্রতিবেশী বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, কারণ তাঁরা ভয় পান যে তাঁদের বাড়িতেও অভিযান হতে পারে।
গ্রেপ্তারের সময় আবেদকে প্রায়ই হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে সৈন্যদের সঙ্গে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে বাধ্য করা হয়। এরপর তাঁকে ভয়াবহ অবস্থায় একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়, খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত করা হয়, মারধর ও গালিগালাজ করা হয়, তারপর হুমকি দেওয়া শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবারই তারা আমাকে আবার কারাগারে পাঠানোর হুমকি দেয়, এমন মনে হয় যেন আমার শরীরের দুই-তৃতীয়াংশ এখনো বন্দি, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বাইরে।’ হুমকির ধরন বদলায়, কিন্তু মূল বার্তা একই থাকে—তিনি আর সবার মতো সাধারণ জীবনযাপন করতে পারবেন না।
আবেদ পরিবারের অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন, কারণ তাঁর উপস্থিতি পরিবারের ক্ষতি করতে পারে বলে তিনি ভয় পান। তাই তিনি কেবল নিকট পরিবারের সঙ্গেই মেলামেশা করেন। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা তাঁকে সতর্ক করেন, তিনি মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তোমার ব্যাপারে আমাদের একদমই ধৈর্য নেই। তোমার কোনো আচরণ অনুচিত মনে হলে বা কোনো চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হলে আমরা তোমাকে সঙ্গে সঙ্গে আবার গ্রেপ্তার করব।’
কারাগারে থাকার সময় আবেদ স্নাতক ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করলেও তিনি চাকরি পাননি। নিয়োগদাতারা তাঁর বারবার গ্রেপ্তারের কথা জানতে পারলে তাঁকে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেন। তাই তাঁকে দৈনিক মজুরির কাজ করে মৌলিক খরচ মেটাতে হয়।
কালকিলিয়ার আরেক সাবেক বন্দি বলেন, শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর ঘন ঘন অভিযানের সময় গড়ে সপ্তাহে দুবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁকে সতর্ক করা হয়, তিনি ফুটবল মাঠে পা রাখলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। এতে রেফারি হিসেবে তাঁর চাকরি ঝুঁকিতে পড়েছে।
আবদুল্লাহ নামের আরেক সাবেক বন্দি ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর এতবার গ্রেপ্তার হয়েছেন যে তিনি গুনতে ভুলে গেছেন। তবে তিনি বলেন, মুক্তির পর থেকে মোট ১৭ বছর তিনি আটক ছিলেন। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁকে ‘প্রশাসনিক আটক’ অবস্থায় রাখা হয়, সে সময় তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। মুক্তির সময় তাঁর ওজন ৬০ কেজি কমে গিয়েছিল।
সাত সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করা আবদুল্লাহকে বারবার গ্রেপ্তার করে কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তাঁর সন্তানদের আতঙ্কিত করা হয় এবং বাড়ি তছনছ করা হয়। তাঁর নিয়োগদাতা বারবার আটকের কারণে বিরক্ত হয়ে তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দেন। এরপর তিনি বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমিতে কাজ শুরু করেন, তবে গ্রেপ্তার ও হুমকির কারণে সেচ, কীটনাশক দেওয়া বা জমি চাষের সঠিক সময় পান না, ফলে ফলন কমে লোকসান হচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে গ্রেপ্তার অভিযানের ঢেউ দেখা গেছে। ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক সংগঠনগুলো নথিভুক্ত করেছে যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় ২৬ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি নারী ও প্রায় ২ হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছেন। এই সংখ্যায় পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, কেবল যাঁরা এখনো আটক রয়েছেন তাঁরা নন।
ফিলিস্তিনি বন্দি সমিতির মুখপাত্র আমানি সারাহনেহ বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি অভিযান এখন দিনরাত অবিরাম আটকের ঢেউয়ে পরিণত হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁরা ইসরায়েলি হেফাজতে থাকেন।
গ্রেপ্তার এখন আর কেবল রাতে হয় না, দিনের বেলাতেও হয়—সামরিক চেকপয়েন্টে এবং মাঠে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে। সারাহনেহ বলেন, ‘এই অভিযানগুলোর ধারাবাহিকতায় নাগরিকদের মধ্যে ভয়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটেছে, যা সামাজিক সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে গ্রামগুলোতে যেখানে মানুষ সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে যে দখলদার বাহিনী যে কোনো মুহূর্তে তাদের শহর বা জনসমাগমস্থলে হানা দিয়ে দলবদ্ধভাবে মানুষকে গ্রেপ্তার করতে পারে।’
এই গ্রেপ্তারগুলোর সঙ্গে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন ও অপমান জড়িত থাকে। আটক ব্যক্তিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে রাখা হয়। ইসরায়েলি অভিযানের সময় ভুক্তভোগীদের বাড়ি তছনছ করা হয় এবং জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। সারাহনেহ বলেন, ‘এই নীতিগুলোর মধ্যে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের, যেমন স্ত্রী ও বোনদের, জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করাও অন্তর্ভুক্ত।’
তিনি বলেন, এসব অভিযানের প্রভাব কেবল আটক ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভয় ও উদ্বেগ গভীর হয়েছে, কারণ তাঁরা এখন চিন্তিত যে গ্রেপ্তার জনসংখ্যার আরও বড় অংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

