‘ক্যামেরা আনবেন না’: লাগোসে চিত্রগ্রাহকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ
নাইজেরিয়ার বৃহত্তম শহর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র লাগোসের রাস্তায় কাজ করার সময় চলচ্চিত্র নির্মাতা, কনটেন্ট নির্মাতা, আলোকচিত্রী ও সাংবাদিকরা হুমকি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শহরের গল্প বলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের আধঘণ্টা পর আজাহ এলাকায় সাউন্ড রেকর্ডিস্ট নুরুদ্দিন সান্নি ও তাঁর দলকে কয়েকজন লোক ঘিরে ধরে। ৪০ বছর বয়সী সান্নি জানান, শুটিং চালিয়ে যেতে তাঁদের কাছে এক লাখ নাইরা (প্রায় ৭৫ ডলার) দাবি করা হয়।
দর কষাকষির সময় ক্যামেরা রক্ষা করতে যাওয়া এক কর্মীকে চড় মারে এক ব্যক্তি। হাতাহাতি শুরু হলে লোকজন ছুরি ও দা বের করে। দলটি পালিয়ে যায়, তবে এক সদস্যের ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং তিনি গুরুতর আহত হন।
সান্নি বলেন, ‘কষ্টের বিষয় ছিল, আমাদের দলের এক সদস্যকে মারধর করা হচ্ছে দেখেও আমরা কিছু করতে পারিনি।’
স্থানীয়ভাবে ‘আগবেরো’ নামে পরিচিত লোকজন—যাদের মধ্যে কেউ কেউ বাণিজ্যিক পরিবহন চালকদের কাছ থেকে শুল্ক আদায় করে—জনসমক্ষে চিত্রগ্রহণ করা লোকজনের কাছে টাকা দাবি করে এবং অস্বীকারকারীদের হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত আগস্টে সংগীত ভিডিও পরিচালক থ্যাংকগড ওমোরি, যিনি টিজি ওমোরি নামে পরিচিত, জানান, ইকোই এলাকায় রাতের শুটিং চলাকালে ভোর প্রায় ৩টায় টাকা দাবি করা একদল লোক শুটিং ব্যাহত করে। তিনি সেটটি সহকারী পরিচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে রেখে চলে যান, একটি দৃশ্য অসমাপ্ত রেখে। পরের দিন সকালে তিনি জানতে পারেন, লোকজন গেট ভেঙে একজন নিরাপত্তারক্ষীকে আহত করেছে, যিনি তাঁদের ঢুকতে দেননি। এ খবর দিয়েছে নাইজেরিয়ার পত্রিকা পাঞ্চ।
অভিনেত্রী ও কনটেন্ট নির্মাতা কিকি জানান, ওবালেন্দে এলাকায় একটি ছোট ভিডিওর শুটিংয়ের পর কয়েকজন লোক তাঁকে ঘিরে ধরে। প্রথমে তাঁদের কাছে ১০ লাখ নাইরা (প্রায় ৭৫০ ডলার) দাবি করা হয়, তবে দর কষাকষির পর তিনি প্রায় সাত লাখ নাইরা (প্রায় ৫২৫ ডলার) দেন। বার্জারের কাছে কারা এলাকায় আরেকটি শুটিংয়ে তিনি নিরাপত্তার জন্য প্রায় পাঁচ লাখ নাইরা (প্রায় ৩৭৫ ডলার) খরচ করেন।
লাগোসভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসবিএম ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক স্ট্যানলি ইকেচুকউ বলেন, নির্মাতারা নিয়মিত হয়রানি ও চাঁদাবাজির কথা জানান। তিনি পরিস্থিতিকে ‘ক্যামেরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন।
বৈশ্বিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আফ্রিকা প্র্যাকটিসের বিশ্লেষক নাবিলা ওকিনো বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতারা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ একটি স্থান ছেড়ে যাওয়া মানে সময় ও অর্থের ক্ষতি। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রায়ই নির্দিষ্ট স্থানে শুটিং করতে হয়, তাই যারা টাকা দাবি করে তারা জানে যে স্থান ছেড়ে আবার শুরু করার খরচ আছে, আর এটাই তাদের নগদ টাকা আদায়ের সুযোগ দেয়।’
নিউজ সেন্ট্রাল টেলিভিশন চ্যানেলে ক্যামেরা অপারেটর হিসেবে কাজ করা কারিনা আদোবাবা-হ্যারি জানুয়ারিতে মাকোকো উচ্ছেদের সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁর দলের কাছে টাকা দাবি করা হয়। তিনি বলেন, ‘এটা আমার কাছে মজার লেগেছিল, কারণ আমরা এখানে তোমাদের গল্প বলতে এসেছি, তোমরা চাও সরকার তোমাদের কথা শুনুক... আর তোমরা চাও আমরা তোমাদের টাকাও দিই। এটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছিল।’
আদোবাবা-হ্যারি বলেন, সংবাদ সংগ্রহের সময় তিনি নিয়মিত টাকা দাবি করা লোকজনের মুখোমুখি হন। কেউ কেউ তাঁর কাছে টাকা নেই শুনে চলে যায়; অন্যরা ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া বা ক্ষতি করার হুমকি দেয়। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা কখনো নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়েছেন অথবা নিয়োগদাতার দেওয়া বিবিধ খরচের তহবিল ব্যবহার করেছেন।
ইকেচুকউ বলেন, এ ধরনের ঘটনা জনগণ শহরের ঘটনা সম্পর্কে কী জানতে পারে, তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ‘বন্যা, আগুন বা প্রতিবাদের সংবাদ সংগ্রহের সময় একজন সাংবাদিককে হয়রানি করা হলে বা তাঁর ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হলে কেবল তাঁকে লুট করা হয় না, জনগণকে তথ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। এতে আত্ম-সেন্সরশিপ তৈরি হয়। সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলতে শুরু করবেন, আর খবর আসবে কেবল নিরাপদ জায়গা থেকে।’
ছোট প্রযোজনা দলগুলোর জন্য অপ্রত্যাশিত অর্থপ্রদান ক্যামেরা ভাড়া, স্থান ভাড়া, কর্মীদের মজুরি ও পরিবহন খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়। কেউ কেউ নিরাপত্তার জন্য বা কোনো স্থানে পৌঁছানোর পর চাপের মুখে টাকা দেওয়ার জন্য বাজেট রাখেন। আদোবাবা-হ্যারি বলেন, টাকা দাবি করা লোকজনের মুখোমুখি হলে তিনি নিজের আচরণ বদলাতে শিখেছেন। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আপনাকে আগবেরোর মতো আচরণ করতে হয়, যাতে তারা দেখে আপনি এতটা শান্ত নন, তখন তারা চলে যায়।’
তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগী ঘটনার কথা জানান না, কারণ অভিযোগ করলে কোনো ব্যবস্থা হবে বলে তাঁদের সন্দেহ থাকে। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করলেও সেখানে লোকগুলোকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। লাগোসে এটাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যদি না আপনার জীবন বিপদে পড়ে। কিন্তু যদি কেবল টাকা নেওয়ার বিষয় হয়, তাহলে কেউ গুরুত্ব দেবে না।’
ইকেচুকউ বলেন, শুটিংয়ের পরিকল্পনা করার সময় লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি এখন আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে ক্যামেরা ভাড়া, স্থান, কর্মী ও খাবারের ওপর “নিষ্পত্তির” জন্য বাজেট রাখতে হয়। এতে খরচ বাড়ে। এতে স্বতঃস্ফূর্ততা মরে যায়; আপনি লাগোসের সুন্দর একটি মুহূর্ত দেখে তা ধারণ করতে পারবেন না। আপনাকে ভাবতে হয়, আমাকে কি হয়রানি করা হবে?’
ওকিনো বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত কমিউনিটি নেতা, বাজার ও পার্ক সমিতি এবং অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে জনসমক্ষে চিত্রগ্রহণের জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম তৈরি করা এবং হয়রানি ও চাঁদাবাজি সহ্য না করা নিশ্চিত করা।
বিদেশি কনটেন্ট নির্মাতারাও লাগোসে হয়রানির কথা জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে চীনা ভ্রমণ কনটেন্ট নির্মাতা শিয়াও জনি শহরের একটি বাজারে চিত্রগ্রহণের সময় লোকজনের মুখোমুখি হওয়ার ভিডিও শেয়ার করেন। তিনি বলেন, তাঁদের কাছে টাকা দাবি করা হয় এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার পথে তিনি ২০টির বেশি চেকপয়েন্টের মুখোমুখি হন, যেখানে তাঁর কাছে অর্থ চাওয়া হয়। চেকপয়েন্টগুলো কারা পরিচালনা করত বা সেগুলো কোনো সরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ওকিনো বলেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা পর্যটক ও প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে নাইজেরিয়ায় চিত্রগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘তাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে নাইজেরিয়ায় প্রযোজনার খরচ ও ঝুঁকি সুবিধার চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে তাঁরা আরও অনুমানযোগ্য ও সরল পরিবেশের প্রতিবেশী দেশ বেছে নিতে পারেন।’
ইকেচুকউ বলেন, পর্যটকদের হয়রানির ভিডিও বিদেশে নাইজেরিয়াকে তুলে ধরার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে বলি, লাগোসে আসুন, কিন্তু আমাদের আচরণ বলে, ক্যামেরা আনবেন না।’
লাগোস রাজ্যের তথ্য ও কৌশলবিষয়ক কমিশনার গবেনগা ওমোতোশো বলেন, জনসমক্ষে ছবি তোলা বা চিত্রগ্রহণ করা লোকজনের কাছে টাকা দাবি করার অধিকার কারও নেই। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দুর্বৃত্ত বলে যে ছবি তোলার আগে, রাস্তায় হাঁটার আগে আপনাকে টাকা দিতে হবে, তা গ্রহণযোগ্য নয়; এ ধরনের ঘটনা পুলিশ দেখবে, সরকার এ ধরনের বাজে কাজ সহ্য করবে না।’
আলোকচিত্র সাংবাদিক জঁ-ফিদেল ই আনানু বলেন, হুমকির কারণে লাগোসকে নথিভুক্ত করার ধরন বদলে গেছে। তিনি প্রতিদিন বেরিয়ে শহরের সৌন্দর্যের ছবি তুলতেন। নিরাপত্তা ও সরঞ্জামের উদ্বেগের কারণে তিনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। ৩১ বছর বয়সী আনানু বলেন, ‘পুরো বিষয়টি ভাবলে কোনো মানে হয় না। যখন দেখি অন্য দেশের মানুষ তাদের দেশের ছবি তুলছে, তখন মনে হয় এখানে কেন একই রকম হতে পারে না। এটা সত্যিই এক পাগলাটে উপদ্রব।’ তিনি বলেন, আলোকচিত্র সাংবাদিক ও রাস্তার আলোকচিত্রীদের জন্য গল্প বলা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

