হজের শতকে লিড ৩১৫, শেষ দিনে রেকর্ড তাড়ার কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ
প্রথম ইনিংসে তাওহীদ হৃদয়ের রেকর্ডগড়া ডাবল সেঞ্চুরির পরও সিলেট টেস্টে স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ দল। চতুর্থ দিনে বল হাতে স্বাগতিক বোলারদের চরম ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে ব্যাট হাতে দাপুটে জবাব দিয়েছে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কাভেম হজের দায়িত্বশীল অপরাজিত শতকে ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট হারিয়ে ৩৪৫ রান তুলে চতুর্থ দিন শেষ করেছে ক্যারিবীয়রা। এর ফলে সফরকারীদের সামগ্রিক লিড দাঁড়িয়েছে ৩১৫ রানে।
ম্যাচের শেষ দিনে এই টেস্ট জিততে হলে বাংলাদেশকে নিজেদের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান তাড়া করার নতুন রেকর্ড গড়তে হবে। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চতুর্থ দিনের খেলা শেষে এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
চতুর্থ দিনের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলারদের পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। সকালে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও ক্যারিবীয় ব্যাটারদের ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি স্বাগতিকরা। প্রথম সেশনে দুটি উইকেট তুলতে সক্ষম হলেও মধ্যাহ্নবিরতির পরের দ্বিতীয় সেশনটি সম্পূর্ণ উইকেটশূন্য কাটাতে হয় তাদের।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর তৃতীয় সেশনে স্পিনার তাইজুল ইসলাম উইকেটে জমে যাওয়া কেভিন উইকহ্যামকে সাজঘরে ফিরিয়ে স্বস্তি এনে দিলেও ততক্ষণে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের শক্ত মুঠোয় নিয়ে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ব্যাট হাতে দিনটিকে পুরোপুরি নিজের করে নেন কাভেম হজ। টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক তুলে নিয়ে তিনি ১৮৯ বলে ১৭টি চার ও একটি ছক্কায় ১৪০ রান করে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। অপর প্রান্তে তাঁকে সঙ্গ দিয়ে আমির জাঙ্গু অপরাজিত আছেন ৪৯ বলে ২০ রান করে; চতুর্থ উইকেটে এই দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে যোগ হয়েছে মূল্যবান ৬১ রান।
এর আগে ওপেনার ব্র্যান্ডন কিংয়ের ৬১ এবং তরুণ ব্যাটার উইকহ্যামের ৭৮ রানের ইনিংস দুটি বড় সংগ্রহের শক্ত ভিত গড়ে দেয়। ম্যাচে হজ ও উইকহ্যামের মধ্যকার ১৬৫ রানের বড় জুটিটিই মূলত বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে ফেলে।
এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে তাওহীদ হৃদয়ের অপরাজিত ২৪২ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসে ভর করে ৩৮৬ রান তুলেছিল বাংলাদেশ, যার সুবাদে ৩০ রানের একটি মূল্যবান প্রথম ইনিংস লিডও পায় স্বাগতিকরা। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের দাপটের সামনে সেই লিডের সুবিধা মুছে গেছে।
টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটি ছিল ২১৫ রানের, যা ২০০৯ সালে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই এসেছিল। ৩১৫ রানে এগিয়ে থাকা সফরকারীদের বিপক্ষে সিলেট টেস্ট বাঁচাতে কিংবা জিততে হলে এখন শান্তর দলকে নিজেদের সেই ১৭ বছর পুরোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে হবে।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে এক অতিমানবীয় ইনিংস উপহার দিলেন তাওহীদ হৃদয়। মিরপুর টেস্টে অবিবেচক শট খেলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া এই তরুণ ব্যাটার ব্যাট হাতে সমুচিত জবাব দিয়ে তুলে নিয়েছেন টেস্ট ক্যারিয়ারের অভিষেক ডাবল সেঞ্চুরি। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে অনন্য এই কীর্তি গড়ে দেশের চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে দ্বিশতকের এলিট ক্লাবে নাম লেখালেন তিনি।
ইনিংসের শততম ওভারে ক্যারিবিয়ান বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যানের প্রথম ডেলিভারি থেকে এক রান নিয়ে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেন হৃদয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে টেস্টে এর আগে দ্বিশতকের দেখা পেয়েছিলেন কেবল তিনজন ব্যাটার—মুশফিকুর রহিম (তিনটি), সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। সেই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে যুক্ত হলেন ২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
এক ইনিংসেই একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন হৃদয়। টেস্ট ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এটিই এখন যেকোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস; এর আগে ২০১৮ সালে মিরপুরে সাবেক ব্যাটার ও ‘সাইলেন্ট কিলার’ খ্যাত মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদের খেলা ১৩৬ রান ছিল সেরা।
পাশাপাশি এটি সিলেটের ভেন্যুতে যেকোনো ব্যাটারের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের নতুন রেকর্ড, যেখানে তিনি ২০২৫ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সতীর্থ মাহমুদুল হাসান জয়ের ১৭১ রানের ইনিংসকে ছাড়িয়ে যান। এ ছাড়া দেশের হয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়া ব্যাটারদের মধ্যেও এটি সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করা মুমিনুল হকের ১৮১ রানের রেকর্ড ভেঙে এ কীর্তি গড়েন তিনি।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী মোমেন্টাম সম্পূর্ণ সফরকারীদের অনুকূলেই ছিল। ওপেনার সাদমান ইসলাম চোটের কারণে ছিটকে যাওয়ায় কার্যত দুই উইকেট বাকি থাকতেই এবং ১৭২ রানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় মাত্র ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। সকালে মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস দ্রুত ফিরে গেলে বড় লিডের স্বপ্ন দেখছিল সফরকারীরা।
কিন্তু অপরপ্রান্তে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন হৃদয়। চরম ধৈর্যের পাশাপাশি সময় বুঝে ক্যারিবিয়ান বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ১১৭ রানের অনবদ্য জুটি গড়েন তিনি। তাইজুল ২২ রানে আউট হলেও বুক চিতিয়ে লড়াই চালিয়ে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলেন এই ডাবল সেঞ্চুরিয়ান।
এর আগে সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনে বল হাতে পেসার হাসান মাহমুদ আলো ছড়ালেও ব্যাট হাতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছিল বাংলাদেশ। সফরকারী ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট হারিয়ে ৮৮ রান তুলে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছিল স্বাগতিকরা। তবে দিনের শেষ ভাগে তাওহীদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিমের মধ্যকার অবিচ্ছিন্ন ৩৭ রানের দায়িত্বশীল জুটি দলকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল।
দ্বিতীয় দিনে ৪ উইকেটে ২৩৫ রান নিয়ে খেলা শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্বিতীয় নতুন বল হাতে নিয়েই স্বাগতিকদের প্রথম সাফল্য এনে দেন হাসান মাহমুদ; আগের দিনের অপরাজিত সেঞ্চুরিয়ান আমির জাঙ্গুকে (১৩৩) বোল্ড করার পরের বলেই সাজঘরে ফেরান রস্টন চেইসকে। এরপর ব্যক্তিগত ২৩ রানে জশুয়া বিশপকে উইকেটকিপার লিটন দাসের স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলে টেস্ট ক্যারিয়ারে পঞ্চমবারের মতো পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান।
এর মধ্য দিয়ে সাবেক পেসার শাহাদাত হোসেনের চারবারের রেকর্ড ভেঙে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ পাঁচ উইকেট নেওয়ার ইতিহাস গড়েন তিনি। এখন শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই—হৃদয়ের রেকর্ড ইনিংসের পরও কি এই টেস্ট বাঁচানো যাবে, নাকি ৩১৫ রানের লিড নিয়ে সিরিজে এগিয়ে যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
