কুর্জকে ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি পলাতক ওয়্যারকার্ড কর্তা মার্সালেকের
পলাতক সাবেক ওয়্যারকার্ড নির্বাহী ইয়ান মার্সালেক দাবি করেছেন, তিনি একটি অভিযানে জড়িত ছিলেন যা ২০২১ সালে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। দণ্ডপ্রাপ্ত এক রুশ গুপ্তচরের কাছে পাঠানো বার্তায় তিনি এ দাবি করেন।
অ্যাক্সেল স্প্রিংগার গ্লোবাল রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কের সংগ্রহ করা নথিতে এ দাবির কথা উঠে এসেছে। ওই নেটওয়ার্কের অংশ পলিটিকো। টেলিগ্রাফ ও গ্লোবাল রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কের দেখা তদন্ত ফাইলে বার্তাগুলোর বিস্তারিত রয়েছে।
তবে নথিতে মার্সালেকের দাবির পক্ষে কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ নেই বলে জানানো হয়েছে।
মার্সালেকের পাঠানো বার্তায় বলা হয়, তিনি এমন একটি অভিযানে জড়িত ছিলেন যা কুর্জকে ‘সফলভাবে ক্ষমতাচ্যুত’ করেছে। বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছিল অরলিন রুসেভের কাছে, যিনি একটি গুপ্তচর চক্রের নেতা ছিলেন এবং পরে ব্রিটেনে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে কারাদণ্ড পান।
জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়্যারকার্ড ২০২০ সালের জুনে ১৯০ কোটি ইউরোর ঘাটতি নিয়ে ধসে পড়ার পর থেকে মার্সালেক পলাতক রয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে খোঁজা ব্যক্তিদের একজন তিনি।
পলায়নের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্রেমলিনের হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ পুলিশ বলছে, তিনি ‘শিল্প’ পর্যায়ের গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত। জালিয়াতির অভিযোগে তিনি খোঁজা হচ্ছেন এবং নিজ দেশ অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের একাধিক দেশে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
কুর্জ ২০১৭ সালে ৩১ বছর বয়সে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর হয়ে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নেতা হয়েছিলেন। দুবার তিনি এ পদে ছিলেন। তবে তাঁর উত্থান দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়, যার মধ্যে ছিল তাঁর পক্ষে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে সরকারি অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ।
রুসেভের নেতৃত্বাধীন গুপ্তচর চক্রের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার করা হলে পুলিশ ব্রিটেনের মাটি থেকে পরিকল্পিত অভিযানের বিস্তারিত বিবরণসহ কয়েক লাখ বার্তা জব্দ করে।
এসব বার্তার কিছু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগ করা হয়। অস্ট্রিয়ার কর্মকর্তারা বর্তমানে তদন্ত করছেন, তাঁদের গুপ্তচররা মার্সালেককে এবং তাঁর মাধ্যমে রাশিয়াকে তথ্য দিয়েছিলেন কি না।
গ্লোবাল রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কের পরীক্ষা করা একটি তদন্ত ফাইলে ‘রুপার্ট টিচ’ ছদ্মনামে ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর মার্সালেকের পাঠানো বার্তা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বার্তা পাঠানো ব্যক্তিকে মার্সালেক বলে শনাক্ত করেছে।
বার্তায় মার্সালেক একজন ‘লোকের’ কথা উল্লেখ করেন যিনি ‘কিছুদিন আমাদের হয়ে কাজ করছিলেন’। তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তি এখন সাবেক চ্যান্সেলরের দলের ‘ডাইনি শিকারের শিকার’।
এরপর তিনি বলেন, তৎকালীন চ্যান্সেলরের এক বন্ধুর মোবাইল ফোন ‘বাজেয়াপ্ত করে’ তাঁরা সাবেক চ্যান্সেলরকে ‘সফলভাবে ক্ষমতাচ্যুত’ করেছেন। মার্সালেকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বন্ধু চ্যান্সেলরের ‘গোপন প্রচার অর্থায়ন’ দেখভাল করতেন।
এরপর মার্সালেক কুর্জের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থমাস শ্মিডের কাছ থেকে জব্দ করা ফোন নিয়ে একটি নিবন্ধের লিংক পাঠান। শ্মিড অস্ট্রিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
শ্মিডের ফোন ২০১৯ সালের নভেম্বরে জব্দ করা হয়। ওই যন্ত্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যাপক যোগাযোগ পরে একাধিক দুর্নীতি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।
২০২১ সালের অক্টোবরে প্রসিকিউটররা কুর্জের সরকার ও তাঁর রাজনৈতিক দল ওভিপির বিরুদ্ধে অভিযান চালান। অভিযোগ ছিল, অনুকূল জনমত জরিপ ও গণমাধ্যম প্রচারের জন্য সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্তের চাপে কুর্জ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দুই সপ্তাহ পর মার্সালেক রুসেভকে লেখেন, ঘটনাটি ছিল ‘বেশ জটিল গল্প’।
পরে একই আলাপে তিনি আবার ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্যের রাজনৈতিক পরিণতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আর বাকি চ্যাটগুলো চ্যান্সেলরকে মেরে ফেলেছে।’
তবে নথিতে এমন কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ নেই যে মার্সালেক আসলেই ফোনটি বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
অস্ট্রিয়ার সাবেক অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা বিভিটির সঙ্গে মার্সালেকের যোগসূত্র নিয়ে ব্যাপক তদন্ত হয়েছে। একাধিক জ্যেষ্ঠ গুপ্তচর ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রুশ রাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য তাঁকে তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মার্সালেক ও রুসেভের মধ্যে বার্তাগুলো অস্ট্রিয়ার পুলিশের ফাইলে রয়েছে, যেখানে ‘বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা — অস্ট্রিয়ার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ’ নিয়ে তদন্ত চলছে। নথিতে নির্বাচন, সরকারি দায়িত্ব লঙ্ঘন ও দুর্নীতি সংক্রান্ত সম্ভাব্য অপরাধের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বার্তাগুলোর ওপর তদন্তকারীদের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ‘মার্সালেক দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন যে তাঁরা একটি সফল অভিযানে চ্যান্সেলরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন।’
ওই মূল্যায়নে আরও বলা হয়, ‘মার্সালেক এভাবে রুসেভের কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনি এই মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।’ তদন্তকারীরা তাই আলাপটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে মার্সালেক চ্যান্সেলরের পতনে ভূমিকা রাখা ফোনটি বাজেয়াপ্ত করার সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি করেছেন।
তবে একই মূল্যায়নে উল্লেখ রয়েছে, মার্সালেকের ‘লোকটি’ বলতে ওয়্যারকার্ডকে বোঝানো হয়েছে নাকি রুশ গোয়েন্দা সংস্থাকে, তা স্পষ্ট নয়।
কুর্জ বার্তাগুলো বা তদন্তকারীদের মূল্যায়ন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।
বার্তাগুলো পাঠানোর সময় মার্সালেক মস্কোতে থাকতেন এবং ব্রিটিশ প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) হয়ে কাজ করতেন।
রুসেভ রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক বুলগেরীয় নাগরিকের একজন। পরে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং রুসেভকে দশ বছর আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ওই চক্রটি ক্রেমলিনের বিরোধী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে নজরদারি অভিযান পরিচালনা করত। তারা অপহরণ নিয়ে আলোচনা করেছিল এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রচারণার পরিকল্পনা করেছিল।
ওই নেটওয়ার্কের কাছে অস্ট্রিয়ার সরকারের সংবেদনশীল তথ্যও ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে টেলিগ্রাফ জানায়, অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তিনটি মোবাইল ফোন রাশিয়ায় পৌঁছে গেছে।



