বাবা নেই, ঋণ করে কেনা ভ্যানটিও চুরি, দিশেহারা প্রতিবন্ধী মা-ছেলে
তিন বছর আগে বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল ১৬ বছরের প্রতিবন্ধী কিশোর স্বপন মাহমুদ। পড়াশোনা ছেড়ে মোটরচালিত ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন যা আয় করত, তা দিয়েই চলত প্রতিবন্ধী মা ও ছোট বোনের সংসার। কিন্তু আড়াই মাস আগে চুরি হয়ে যায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন সেই ভ্যানটি। এরপর থেকেই চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছে তিন সদস্যের পরিবারটির।
জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দিনমজুর পিতা। এরপর পড়াশোনা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরে ১৬ বছর বয়সী কিশোর ছেলে স্বপন মাহমুদ। তার বাম পায়ে শক্তি নেই, সে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। ভারী কোনো কাজ করতে পারে না স্বপন।
স্বপনের মা জোসনা খাতুনও শারীরিক প্রতিবন্ধী। ধারদেনা ও ঋণ করে একটি মোটরচালিত ভ্যান কিনে দিয়েছিলেন ছেলে স্বপনকে। ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিনশ টাকা আয় করত স্বপন। তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলছিল মা শারীরিক প্রতিবন্ধী জোসনা খাতুন, ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বপন মাহমুদ ও মেয়ে নয় বছর বয়সী মারিয়ার।
কিন্তু প্রায় আড়াই মাস আগে নিজ বাড়ি থেকে উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে ভ্যান হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে অসহায় এই পরিবারটি।
রোববার (৮ নভেম্বর) কুমারখালীর লাহিনীপাড়া-সান্দিয়ারা জিকে খাল সড়কের যদুবয়রা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর বাজার এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে সামান্য জমিতে একটি টিনের খুপড়ি ঘর। ঘরের ছোট্ট বারান্দায় প্রতিবন্ধী জোসনা খাতুন দুই সন্তান নিয়ে বসে আছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারীরিক প্রতিবন্ধী জোসনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী তিন বছর আগে মরে গেছে স্ট্রোক করে। ছেলের একখেন ভ্যান কিনে দিছলাম। সেই ভ্যানডা চুরি হয়া গেছে। না খ্যায়াই দিন পার করি। এখন চলব কেমনে দুইডা সন্তান লইয়া। আমি প্রতিবন্ধী। ছেলেও প্রতিবন্ধী। ভারী কাজ করতি পারি না। স্বামী মারা যাওয়ার পর এই দিন আইবো চিন্তাও করতে পারিনি। আমি নিঃস্ব। আমি ও আমার সন্তানরা ঠিকমত চলতি পারি না।’
জোসনা খাতুন বলেন, একটা ভ্যান কিনতে ৭০-৮০ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু এতো টাকা পাবো কোনে? প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কখনও চাল ডাল, আবার কখনও রান্না করা খাবার দিচ্ছে। তা দিয়ে চলি। কেউ যদি একটা ভ্যান কিনে দিতো তাহলে খায়ে পড়ি বাঁচতাম।
এ সময় শারীরিক প্রতিবন্ধী কিশোর স্বপন মাহমুদ বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। এরপর সংসার চালাতে পড়াশোনা বন্ধ করে ভ্যান চালানো ধরি। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিনশ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে কোনোমতে মা-বোনের খাওয়াতাম। কিন্তু সেটিও (ভ্যান) চুরি হয়ে গেছে। এখন চেয়ে চিন্তে কোনোমতো চলছে সংসার। আমি প্রতিবন্ধী। ভারী কাজ করতে পারি না। একটি ভ্যান হলেই আবার করে খেতে পারতাম।
প্রতিবেশী ও যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মরিয়ম খাতুন বলেন, খুবই গরিব ও অসহায় পরিবারটি। ভ্যান হারানোর পর মানবেতর জীবনযাপন করছে। সবাই মিলে যা খাওয়ার দেয় তা দিয়ে তিনজন কোনোরকম দিন পার করছে। তারা কোনোমতে বেঁচে আছে। এখন একটি ভ্যান কিনে দিলেই পরিবারটি বাঁচতো।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, আমি এই বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে অবগত হয়েছি। প্রতিবন্ধী কিশোরের ভ্যান চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। লিখিত আবেদন দিলে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ভ্যান দেওয়া যায় কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা করা যায় তা সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে।

