জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বৃহত্তর ঐক্যের পথে ১১ দল, গঠিত হচ্ছে সংস্কার পরিষদ

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এবার বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দল, বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের নিয়ে তারা একটি বৃহৎ ঐক্য গড়তে চাইছে।
গত কয়েক মাস ধরে সভা-সেমিনার, বিক্ষোভ ও লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য। এসব কর্মসূচির পরও সরকারের কাছ থেকে দাবি পূরণের দৃশ্যমান উদ্যোগ না পেয়ে এবার আন্দোলনের আকার বাড়াতে কৌশল বদল করতে যাচ্ছে তারা। জোটের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।
এ লক্ষ্যে 'সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ' নামে বিশেষ একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জোটের একাধিক সূত্র জানায়, কমিটির সদস্যসংখ্যা চূড়ান্ত না হলেও প্রাথমিকভাবে ১০ থেকে ১৫ সদস্য রাখার আলোচনা চলছে। এতে জামায়াতে ইসলামী থেকে তিন-চারজন এবং জোটের অন্য শরিকদের প্রত্যেকের একজন করে প্রতিনিধি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংসদের বাইরের রাজনৈতিক নেতারাও কমিটিতে স্থান পেতে পারেন। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিটির সদস্যদের নাম ও কার্যপরিধি নির্ধারণের প্রাথমিক কাজ চলছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আজকের পত্রিকাকে বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন এবং এর করণীয় ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে ১১ দলের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে একটি প্রস্তাব তৈরি করে শীর্ষ নেতাদের কাছে দেওয়া হবে।
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, '১১ দলের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সরকারের সঙ্গে আছে, কিছু দল আছে মাঝামাঝি অবস্থানে। যারা মাঝামাঝি আছে, তাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কথা হবে। অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গেও আলোচনা হবে। সরকার যেহেতু বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে না, ১৮০ দিন চলে যাচ্ছে, ৯ তারিখ অধিবেশন। তাহলে এর বিকল্প কী হতে পারে, সেটা নিয়ে সবার সঙ্গেই আলোচনা করা হবে।'
লিয়াজোঁ কমিটির প্রস্তাব পর্যালোচনা করে শীর্ষ নেতারা চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। এরপর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, 'শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আমরা এ রকম একটা কমিটি করব। কমিটির কার্যক্রমসহ কী কী কর্মসূচি নেওয়া যায়, কী কী করণীয়—এসব বিষয়ে সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সেই আলোকে নামের খসড়া, সদস্যসংখ্যা এবং কাদের রাখা যায়, তার একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জামায়াতের আমিরের কাছে পর্যবেক্ষণের জন্য এটি উপস্থাপন করা হবে।'
কমিটির কার্যক্রম শুধু মূল পরিষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না ১১ দলীয় জোট। জোটের সূত্রগুলো জানায়, বিভিন্ন পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক উপকমিটি গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উপকমিটি সংবিধান সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করে মূল পরিষদের কাছে তুলে ধরবে।
পাশাপাশি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ১১ দলীয় ঐক্যের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরও এই উদ্যোগে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তাঁদের মূল কমিটিতে রাখা হবে, নাকি আলোচনার অংশীজন হিসেবে সম্পৃক্ত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ সোমবার। এই অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইবে দলটি।
জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা তো চাই এই অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কী করছে, এটা নিয়ে আপডেট দিক। কিন্তু সে রকম কিছু মনে হয় তাদের অ্যাজেন্ডাতে নাই। যতটুকু শুনছি, নিয়ম রক্ষার একটা অধিবেশন হবে।'
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই সংস্কারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ সব বিষয়ে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায় সরকার। বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে গতকাল চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই দেশের সকল সমস্যার সমাধান করতে চাই এবং সকল সমস্যা পার্লামেন্টে নিয়ে আসছি সমাধান করার জন্য।'
একই দিনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামকে আহ্বায়ক এবং তানভীর আহমেদ রবিনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।



