ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে অঙ্গ হারানো মানুষের নতুন লড়াই: কৃত্রিম পা, ফুরিয়ে আসা সহায়তা
রিকার্ডো কনত্রেরাসের নতুন পা-টি রাখা একটি কাঠের কাউন্টারের ওপর। জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলা কেঁপে ওঠার চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ এখনো তাঁর আঘাত থেকে সেরে উঠছেন।
২৪ জুন রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিলেন রিকার্ডো। উদ্ধারের অপেক্ষায় তাঁকে কাটাতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পড়ে যাওয়া একটি দরজার ফ্রেমের নিচে তাঁর বাম পা চাপা পড়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; শেষ পর্যন্ত পা-টি কেটে ফেলতে হয়।
রিকার্ডো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমরা বেঁচে গেছি।’ পাশে থাকা ১৬ বছর বয়সী ভাই আন্দ্রেস কনত্রেরাসের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতে যখন জানলাম আন্দ্রেস ভালো আছে, তখন আমার পায়ের কথা খুব একটা ভাবিনি। আন্দ্রেসের ভালো থাকাটাই আমি হাজারবার বেছে নিতাম।’
কিন্তু এখন রিকার্ডো নিজেকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। তিনি ও তাঁর ভাই দুজনই আঘাতের জন্য ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। এক প্রখর রোদের বিকেলে কারাকাসের উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকার একটি ছোট ওয়ার্কশপে তিনি বসে ছিলেন, নতুন কৃত্রিম পায়ের জন্য প্রস্তুতির পুনর্বাসন ব্যায়াম করার অপেক্ষায়।
রিকার্ডো বলেন, ‘এখন বিষয়টা হলো ভূমিকম্পের আগে আমার যে স্বাধীনতা ছিল, তার কিছুটা ফিরে পাওয়া, কারণ সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।’
তবে সেরে ওঠাই তাঁর একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। ভবন ধসে তাঁর মা-বাবা দুজনই মারা গেছেন।
সরকারি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভূমিকম্প দুটিতে ৬ হাজার ৫০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ২ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৬ জন। সরকার বলছে, অঙ্গ হারানো ব্যক্তিদের একটি তালিকা (সেন্সাস) তৈরি করা হয়েছে, তবে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে সম্পদ ও সহায়তাও ক্রমশ কমে আসছে, বিশেষ করে বিশ্বের মনোযোগ সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অনুদান শুকিয়ে গেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প সহায়তা চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের মধ্যে তারা সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার—ঘাটতি ৫৫ শতাংশ।
একই মাসে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, তাদের ভেনেজুয়েলা কার্যক্রমের অর্থায়ন হয়েছে মাত্র ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
কারাকাসে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির ওয়ার্কশপ অর্তোপ্রোতেকনিকায় পরিচালক বিয়াংকা দামাসো রিকার্ডোর মতো বেঁচে যাওয়া মানুষদের সেরে ওঠার পরের ধাপগুলোতে সাহায্য করছেন। অঙ্গ হারানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম অঙ্গের জন্য প্রস্তুত হতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন ও প্রস্তুতি লাগে—কখনো আরও বেশি, ক্ষত সারার গতি ও আগের স্বাস্থ্য অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
দামাসো বলেন, বেছে নেওয়ার জন্য ১০০-র বেশি ধরনের হাঁটু আছে, আর ত্বকের রঙের ২০০-র বেশি শেড। তবে প্রক্রিয়াটি প্রথমবার লাগিয়েই শেষ হয় না। শিশুদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে পাঁচ-ছয়টি পর্যন্ত প্রতিস্থাপন কৃত্রিম অঙ্গ লাগতে পারে, আর প্রাপ্তবয়স্কদের দরকার হতে পারে নিয়মিত সমন্বয় ও মেরামত।
এরপর আছে মানসিক বাধা। অনেক ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত মানুষ ব্যবহারিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবেন—তাঁরা আবার হাঁটতে পারবেন কি না, হুইলচেয়ার লাগবে কি না, কিংবা স্বাধীনভাবে প্রস্রাব করতে পারবেন কি না। দামাসোর অভিজ্ঞতায়, অনেকে এও ভাবেন, তাঁদের ভালোবাসার মতো সঙ্গী তাঁরা পাবেন কি না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২৪ জুনের এই ট্র্যাজেডির শারীরিক ও মানসিক ধাক্কার কারণে বেঁচে যাওয়া মানুষদের সেরে ওঠা সম্ভবত হবে আজীবনের এক প্রচেষ্টা। অঙ্গ ও পরিবারের সদস্য হারানোর পাশাপাশি তাঁদের সামনে এখন আজীবন স্বাস্থ্য খরচের সম্ভাবনা—আর সহায়তা ক্রমশ কমে আসছে।




