সারের ডিলার নিয়োগে ব্যাপক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ: তদন্তে সংসদীয় কমিটির তিন সদস্যের কমিটি, প্রমাণ মিললে ডিলারশিপ বদল বললেন কৃষিমন্ত্রী

কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দিতে বিএনপি সরকার নতুন করে ডিলার নিয়োগ দিলেও সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে; অভিযোগ তদন্তে সোমবার তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সার ডিলার রয়েছেন ৫ হাজার ২০০ জন এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলার রয়েছেন ৫ হাজার ৬০০ জন। সম্প্রতি সরকার আরও সাড়ে চার হাজারের বেশি সার ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের একটা বড় অংশের অতীতে সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই, নিজের গুদামও নেই; অর্থের বিনিময়ে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের ডিলার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা আর্থিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ভবিষ্যতে সার সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি করতে পারেন। ভুক্তভোগী কৃষকসহ বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যমেই ডিলারশিপের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
যশোরে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৯৮ জনের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন বিএনপির নেতা-কর্মী ও তাঁদের নিকট স্বজন বলে জানা গেছে। চৌগাছা উপজেলায় অনুমোদনের এক নম্বর তালিকায় নাম রয়েছে পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা আউলিয়ার ‘মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্স’-এর; দলীয় প্রভাবেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অনেকের অভিযোগ।
চৌগাছায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ও সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম নিজেরা আবেদন না করে পরিবারের সদস্যদের দিয়ে ডিলারশিপ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাতিবিলা ইউনিয়নে জহুরুলের স্ত্রী রহিমা আক্তার লিপিকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যদিও ওই ইউনিয়নে সার বিক্রির পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা চারজন আবেদন করেছিলেন। হাকিমপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া মেসার্স নিশান ট্রেডার্সের মালিক মাসুদুল হাসানের ষাটোর্ধ্ব মা আমেনা বেগম; অথচ বিএনপি নেতা হাসান কিংবা তাঁর মা কখনোই সার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের আপন ছোট ভাই মো. মনিরুজ্জামান, যিনি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিম; তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। অভিযোগের জবাবে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গুদাম নির্মাণের সক্ষমতা যাচাই করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে নতুন করে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন ৮৫ জন; তাঁদের মধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী, বাকিদের বেশির ভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারী নেতা-কর্মী অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্য। চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া আলিফ ট্রেডার্সের জিনিয়া পারভিন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী; সরদহ ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ইসরাত জাহানের অথৈই অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্স; ইউসুফপুর ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা। বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নে আতিক ট্রেডার্সের মালিক জোবাইদা খাতুন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন পলাশের স্ত্রী।
তানোর উপজেলার সরনজাই ইউনিয়নের মেসার্স শাহনেওয়াজ ট্রেডার্সের মালিক শাহনেওয়াজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে; বাধাইড় ইউনিয়নের মেসার্স মর্জিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক সিদ্দিকা তামান্না উপজেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মামুনুর রশিদের স্ত্রী; তালন্দ ইউনিয়নে মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক ওমর ফারুক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নানের ছেলে। পুঠিয়া পৌরসভায় ডিলার হওয়া মেসার্স ফারিশ ট্রেডার্সের মালিক সাহেদ হাসান রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতজামাই। মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নে শাপলা ট্রেডার্সের মালিক উমর ফারুক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেকের ছেলে; পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে মেসার্স ইপ্তি এন্টারপ্রাইজের মালিক নাঈম ওয়াসিফ উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে এবং হরিয়ান ইউনিয়নে মেসার্স তাইফ ট্রেডার্সের মালিক আতিকুর রহমান উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের ছেলে।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মৃধার দুই সহোদর আরিফ মৃধা ও সোহেল মৃধা; আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু ভাইয়ের পরিচয়ে তাঁরা ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে এলাকাবাসীর অনেকের অভিযোগ। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ দাউদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বাবা আব্দুল বাতেনকে তমরদ্দি ইউনিয়নের মেসার্স আইমান এন্টারপ্রাইজের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে; প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ দাউদ।
কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় নতুন ৭৫ ডিলারের ৬০ জনই বিএনপির নেতা-কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে; কুড়িগ্রাম সদরের ৯ ডিলারের সবাই বিএনপিসংশ্লিষ্ট। সাতক্ষীরায় জেলাব্যাপী নিয়োগ পাওয়া ৮০ ডিলারের বড় অংশ ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। মৌলভীবাজারে অনুমোদিত ৫৮ জন ডিলারের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
গত ১২ অক্টোবর ময়মনসিংহের গৌরীপুর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মেসার্স মুন্সী এন্টারপ্রাইজের মালিক ও পৌর কৃষক দলের সভাপতি মো. গোলাম কাজীয়েল হাজাত শাহী মুন্সী ডিলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে টাকা লেনদেনের অভিযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতি ডিলার নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অলিখিত বাণিজ্য হয়েছে এবং এতে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা জড়িত; লটারিতে প্রথম স্থান পেয়েও তিনি ডিলারশিপ পাননি বলেও তিনি দাবি করেন। ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ এক ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলে লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হবেন, আর অর্থের বিনিময়ে সার ডিলারশিপ দেওয়া হবে—এমনটা হতে পারে না।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় এই দলের অনেক লোক ডিলারশিপ পাবে—এটাই এ দেশের স্বাভাবিক ঘটনা; তবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি ও কৃষি কর্মকর্তাদের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়া অস্বাভাবিক। তাঁর ভাষ্য, যারা টাকা দিয়ে ডিলারশিপ পেয়েছে, তারা বাড়তি দামে সার বিক্রি করে সেটা পুষিয়ে নিতে চাইবে; সরকার চাইলে অনিয়মের মাধ্যমে পাওয়া ডিলারশিপ পরিবর্তন করতে পারে এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়িয়ে অনিয়ম বন্ধে কঠোর হতে হবে।
অন্যদিকে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম। সোমবার রাতে তিনি বলেন, ‘শতভাগ নীতিমালার আলোকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জেলা-উপজেলা কমিটির বাছাইপ্রক্রিয়াকে। ফলে সারা দেশে সার সরবরাহব্যবস্থায় কোনো সংকট হবে না।’ তিনি আরও বলেন, কোথাও ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; ডিলার নিয়োগ অস্থায়ী ভিত্তিতে হয়েছে এবং অনিয়ম পেলে বাতিল করা হবে।
সোমবার কৃষি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, শর্ত অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ পরিবর্তন করা যাবে। স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, যেসব এলাকায় ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সোমবার গঠিত তিন সদস্যের কমিটি অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি সার বিতরণ ও মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও দেখবে।



