এক দশকে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে ১০ শতাংশ
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বছরে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি মোট বাণিজ্যের ৪০ শতাংশের আশপাশে; বাকিটা আমদানি।
বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ওভেন ও নিট পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য জাপানে রপ্তানি হয়। বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয় লোহা, ইস্পাত, জাহাজ, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি।
জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) করেছে বাংলাদেশ। তবে সেই চুক্তির সুফল এখনো পুরোপুরি রপ্তানিতে পড়েনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানে গেছেন। এই সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার কারখানা ও জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করার কথা রয়েছে তাঁর।
জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া বলছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করতে চায় জাপান। অটোমোবাইল ও অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে এই বিনিয়োগে আগ্রহী দেশটির উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে জাপানে ১০১ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ কোটি ডলারে। সেই হিসাবে এক দশকে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে দেশটি থেকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে জাপানে প্রায় ৪০০ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। রপ্তানির বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এ ছাড়া হিমায়িত মাছ ও জলজ প্রাণী, ফলমূল ও বাদাম, চা-কফি-মসলা, শস্য, তেলবীজ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীও রপ্তানি হয়। তালিকায় আরও আছে আসবাব ও প্রকৌশল পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, রাবার, ওষুধ, খেলনা ও খেলাধুলার সামগ্রী, কাঠের পণ্য এবং কাগজ ও মুদ্রিত বইপত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে প্রায় ১৮৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়। আমদানি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্থান দখল করে আছে লোহা ও ইস্পাত, যা দেশটি থেকে মোট আমদানির ৩৭ শতাংশ। আমদানির দ্বিতীয় শীর্ষ পণ্যের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও এর যন্ত্রাংশ। এ ছাড়া জাহাজ, নৌকা, ভারী যন্ত্রপাতি, বয়লার, খনিজ জ্বালানি, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে আমদানির তালিকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাপান থেকে ৫২ লাখ ডলারের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে ট্রেডিং খাতে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে। এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি ডলারের বেশি এফডিআই এসেছিল। ২০১৮ সালে জাপান টোব্যাকো ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে। মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, মিৎসুবিশি, মারুবেনিসহ বাংলাদেশে নিবন্ধিত জাপানি কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৩৫০।
জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) তথ্য অনুসারে, জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে টানা তিন বছর ধরে ব্যবসা প্রসারের জন্য সেরা ২০টি সম্ভাবনাময় দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়াতে আগ্রহী। জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ইতিমধ্যে জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে।
জাপানের বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে জাপান–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, এখন অনেক বেসরকারি জাপানি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এই বিনিয়োগ এলে স্থবির অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। এ জন্য উভয় দেশের পার্লামেন্টে দ্রুত ইপিএ অনুমোদন (র্যাটিফিকেশন) করিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ ও তা বহাল রাখতে হবে বলেও তিনি বলেন।




