মার্কিন মিডটার্মে অর্থের ঝড়: শীর্ষ ৫০ দাতার ২৭৭ কোটি ডলার, সবার ওপরে ইলন মাস্কের ৪৪ কোটি ৬০ লাখ
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচন দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে চলেছে। শুধু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই ব্যয় ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ আগের যেকোনো নির্বাচনচক্রের চেয়ে বেশি। বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাবে এই তথ্য উঠে এসেছে।
এই অর্থের বড় অংশ আসছে ধনী দাতা, রাজনৈতিক অলাভজনক সংগঠন এবং ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার বদলে দিতে চাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। ৩ নভেম্বরের ভোটের আগে ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) তথ্য বিশ্লেষণ করে আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে বড় দাতাদের চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মিডটার্ম চক্রে এ পর্যন্ত ৫০টি বৃহত্তম দাতা ও সংগঠন মিলিয়ে মোট ২৭৭ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। এর মধ্যে রিপাবলিকান-ঘেঁষা দাতাদের অনুদান ১৬৭ কোটি ডলার, যা মোটের প্রায় ৬০ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা দাতাদের অনুদান ৮৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, প্রায় ৩০ শতাংশ — রিপাবলিকানদের তুলনায় অর্ধেক। বাকি ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার, প্রায় ১০ শতাংশ, এসেছে দ্বিদলীয় বা বিশেষ স্বার্থের দাতাদের কাছ থেকে, যাদের মধ্যে ক্রীড়া বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সমর্থক গোষ্ঠীও রয়েছে।
২০২৫-২৬ নির্বাচনচক্রে একজন ব্যক্তি কোনো ফেডারেল প্রার্থীর প্রচারে সরাসরি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ ডলার দিতে পারেন। অথচ এই তালিকার কয়েকজন দিয়েছেন শত শত কোটি ডলার। এটি বৈধ, কারণ অর্থের বেশিরভাগ গেছে প্রার্থীদের কাছে নয়, সুপার পিএসি নামে পরিচিত কমিটিগুলোর কাছে, যারা যেকোনো অঙ্কের অনুদান নিতে পারে।
সুপার পিএসি হলো এমন একটি গোষ্ঠী, যা মূলত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রার্থীদের পক্ষে বা বিপক্ষে সীমাহীন অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করতে পারে। একমাত্র শর্ত হলো, এই ব্যয় প্রার্থী বা তাঁদের প্রচার শিবিরের সঙ্গে সমন্বয় করে করা যাবে না। ২০১০ সালে আদালতের দুটি রায়ের পর স্বতন্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সীমাহীন নির্বাচনি ব্যয়ের পথ খুলে গেলে সুপার পিএসির উত্থান ঘটে।
সুপার পিএসিগুলোকে তাদের দাতাদের নাম এফইসির কাছে জানাতে হয়। কিন্তু ওয়ান নেশন ও মেজরিটি ফরোয়ার্ডের মতো কয়েকটি বড় অনুদানকারী নিজেরাই অলাভজনক সংগঠন, যাদের নিজেদের দাতাদের নাম প্রকাশ করতে হয় না। ফলে রাজনৈতিক অর্থের আসল উৎস অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়, যাকে ‘ডার্ক মানি’ বা অন্ধকার অর্থ বলা হয়।
হার্ভার্ড আইন স্কুলের অধ্যাপক ও প্রচার-অর্থায়ন সংস্কারের পক্ষের আইনজীবী লরেন্স লেসিগ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা রাজনীতিবিদদের কাছে অন্ধকার নয়। অন্ধকার শুধু আমাদের কাছে। রাজনীতিবিদদের পক্ষে অর্থ কোথা থেকে আসছে তা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই, এবং তাঁরা জানেন তাঁদের কী করতে হবে।’
এই চক্রের সবচেয়ে বড় একক দাতা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। রিপাবলিকান-ঘেঁষা গোষ্ঠীগুলোকে তিনি দিয়েছেন ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তাঁর পরের অবস্থানে রয়েছেন শিপিং সরঞ্জাম কোম্পানি ইউলাইনের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড উইলাইন এবং ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান সাসকুয়েহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ ইয়াস ও তাঁর স্ত্রী জ্যানিন ইয়াস। তাঁদের সবাই রিপাবলিকান-ঘেঁষা গোষ্ঠীগুলোকে অনুদান দিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা শিবিরের সবচেয়ে বড় দাতারা হলেন বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী ও ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সোরোস, নিউইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র ও আর্থিক তথ্য কোম্পানি ব্লুমবার্গের প্রতিষ্ঠাতা মাইক ব্লুমবার্গ এবং লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ও তাঁর স্ত্রী মিশেল ইয়ে।
চারজন একক দাতা প্রত্যেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। লেসিগের মতে, আসল উদ্বেগ নির্বাচনের মোট ব্যয় নয়, দাতাদের এই কেন্দ্রীভবন। তাঁর ভাষায়, ‘সমস্যা ব্যয় নয়। সমস্যা দাতাদের কেন্দ্রীভবন। টেবিলে ১০ কোটি ডলার রাখার সামর্থ্য না থাকলে গণতন্ত্রে মানুষের যেভাবে গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেভাবে আপনি গুরুত্ব পাবেন না।’
সংগঠনগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাজনৈতিক অলাভজনক সংগঠনগুলো, পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ও একটি একটি শিল্পগোষ্ঠী। রিপাবলিকান পক্ষে সবচেয়ে বড় সংগঠন সিনেট রিপাবলিকান নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ অলাভজনক সংগঠন ওয়ান নেশন, এরপর রয়েছে আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক।



