বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় আর শিক্ষাঋণের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর বয়সীরা: বিয়ে, বাড়ি কেনা আর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাই অনিশ্চিত
উন্নত জীবন, ভালো আয় আর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকেই স্বপ্নের দেশ মনে করেন। কিন্তু সেই দেশেও ৩০ বছর বয়সী অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে বাড়ি কেনা, সংসার গড়া কিংবা সন্তান নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষাঋণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। জীবনের যে সময়ে ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়ার কথা, সেই বয়সেই অনেকের কাছে এখন জীবন চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকার প্রায় দুই ডজন তরুণ-তরুণীর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, তাঁদের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের যে স্বচ্ছলতার প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক কঠিন।
কুইন্সের এক ৩০ বছর বয়সী নারী নিজের জন্মদিনে কেক কেটেছেন, শ্যাম্পেনও খুলেছেন। কিন্তু উদ্যাপনের আড়ালেও ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—হাতে নেই পর্যাপ্ত সঞ্চয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও অনিশ্চিত।
ম্যানহাটনের আরেক ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তি বিয়ের খরচ বহন করতে পারছেন না। ব্রুকলিনে বসবাসরত এক দম্পতি ভাবছেন, বয়স্ক মা-বাবার পাশে থাকতে শহরে থাকবেন, নাকি সেখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাবেন। তাঁদের মতো অনেকের কাছেই ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত এখন আর শুধু পছন্দের বিষয় নয়, বরং আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে জড়িত।
ম্যানহাটনের ৩০ বছর বয়সী অ্যাডাম ক্রিটেনডেনের মতো অনেকের কাছে বিয়ে, সন্তান নেওয়া কিংবা বড় বাসায় ওঠার পরিকল্পনা এখন অনিশ্চিত। তাঁর হিসাবে, নিউইয়র্কে দুই শয়নকক্ষের একটি বাসার ভাড়া মাসে ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এমন খরচের মধ্যে সংসার শুরু করা কঠিন।
হার্ভার্ড ইয়ুথ পোলের এক জরিপে দেখা গেছে, আগের প্রজন্মের তুলনায় নিজেদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি তরুণ। অনেকের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন; প্রত্যাশা ছিল, এই বয়সে এসে তাঁরা আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হবেন, বাস্তবে অনেকেই সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারছেন না।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যেও দেখা গেছে, বিভিন্ন বয়সের অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণদের জন্য আর্থিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো অর্জন করা কঠিন।
শিক্ষাঋণও বড় চাপ তৈরি করছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরি পেলেও অনেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারছেন না। ম্যানহাটনের এক নারী নিজের মায়ের প্রজন্মের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, আগের প্রজন্ম যে সুযোগগুলো পেয়েছিল, বর্তমান সময়ে সেগুলো অর্জন করা অনেক কঠিন।
৩১ বছর বয়সী ফিওনা কার্নস ও তাঁর স্বামী—দুজনই সরকারি স্কুলের শিক্ষক। তারপরও তাঁরা দুই শয়নকক্ষের একটি বাসা কেনা বা ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য পাচ্ছেন না। শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতি তাঁদের মধ্যে কষ্ট ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
নিউইয়র্কের ব্যয়বহুল জীবন থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথাও ভাবছেন অনেক তরুণ পেশাজীবী। এর প্রভাব পড়ছে শহরের জনসংখ্যা ও স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির ওপরও; জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো শহর ছেড়ে চলে গেলে স্থানীয় স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ৩০ বছর বয়সী তরুণদের এই হতাশা রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। তাঁদের একটি অংশ ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা এবং জোহরান মামদানি ও তাঁর সমর্থকদের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। চলতি মাসে ৩৫ বছরে পা দেওয়া মামদানি নিউইয়র্কের রাজনীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া ও সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। তরুণ বয়স ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পরিবর্তন নিয়ে গবেষক জেফরি জেনসেন আর্নেট মনে করেন, এই বয়সে অনিশ্চয়তা থাকা অস্বাভাবিক নয়। জীবনের পথ সবার জন্য এক নয়, তাই ৩০ বছর বয়সেই সবকিছু অর্জন করতে হবে—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তরুণদের এসব অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ৩০ বছর বয়সে পৌঁছানো মানেই আর্থিক স্থিতিশীলতা বা ব্যক্তিগত জীবনের সব লক্ষ্য পূরণ নয়। উচ্চ ব্যয়, আবাসন সংকট, চিকিৎসা খরচ ও ঋণের চাপে বাড়ি কেনা, বিয়ে করা কিংবা সন্তান নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও এখন তাঁদের কাছে দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে উঠেছে—আর তাতে প্রশ্ন উঠছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ নিয়েও।



