দিল্লি এড়িয়ে মুম্বাই হয়ে জামনগরে রুবিও: রিলায়েন্সের শোধনাগার ঘিরেই মার্কিন জ্বালানি হিসাব

ভারত সফরে আসা বিদেশি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের গন্তব্য সাধারণত রাজধানী নয়াদিল্লিই হয়। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দিল্লি এড়িয়ে তিনি গেছেন গুজরাটের পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগর জামনগরে, যেখানে এশিয়ার অন্যতম ধনী মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্সের বিশাল তেল শোধনাগার অবস্থিত।
মঙ্গলবার ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ে পৌঁছান রুবিও। সেখানে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর জামনগরে গিয়ে তিনি সফর শেষ করেন। চলতি বছর এটি ছিল রুবিওর দ্বিতীয় ভারত সফর।
সফর ঘোষণার সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক হবে এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয়। সরকারিভাবে ঘোষিত সফরসূচিতে নয়াদিল্লির নাম ছিল না। বিষয়টি বিশেষ করে ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানী এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কৌশলগত বিবেচনা ছিল, আর সফরের সময় ও স্থান নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে বলেন, ‘দিল্লিতেই আস্থার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও নীতিতে সেখানকার কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট।’
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীরা শঙ্কর অবশ্য রাজধানী এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত জ্বালানিকেন্দ্রিক সফর ছিল। তা ছাড়া রুবিও মুম্বাইয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।’
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে যাওয়ায় উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা সমঝোতা চূড়ান্ত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রায় ২০ মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি।
কূটনৈতিক বৈঠক শেষে রুবিও যান জামনগরে। রিলায়েন্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জামনগরের শোধনাগার কমপ্লেক্সে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা যায়; বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ এই কমপ্লেক্সের দখলে। ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় রপ্তানিকারকও রিলায়েন্স।
বুধবার কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শোধনাগারটি পরিদর্শন করেন রুবিও; এ সময় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারও সীমিত ছিল। তিনি শোধনাগার ঘুরে দেখেন এবং মুকেশ আম্বানিসহ আম্বানি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে এক বিবৃতিতে রিলায়েন্স জানায়, এই সফরে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং প্রচলিত ও নতুন জ্বালানির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। তবে অপরিশোধিত তেল কেনা বা পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কি না, বিবৃতিতে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
মীরা শঙ্করের মতে, শোধনাগার পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাজারে আরও বেশি পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে ওয়াশিংটন কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে তেল পরিশোধনের নতুন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম থাকায় বিপুল পরিমাণ তেল পরিশোধনের ভারতের সক্ষমতাই বাজারের চাপ কমাতে ওয়াশিংটনের জন্য একটি সম্ভাব্য পথ খুলে দিয়েছে।
এর ঠিক এক দিন আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভারতকে ‘জ্বালানি পরিশোধনের পরাশক্তি’ বলে অভিহিত করেন রুবিও। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় রিলায়েন্স আরও বেশি ভেনেজুয়েলার তেল পরিশোধন করুক। রুবিও বলেন, ‘ভারতের ভারী অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। অতীতেও তারা তা করেছে। আমার ধারণা, ভেনেজুয়েলার তেল যখন আরও বেশি পরিমাণে বাজারে আসবে, তখন ভারত এ কাজ করতে পারবে।’ তাঁর মতে, স্বল্প মেয়াদে ভেনেজুয়েলার তেল নিশ্চিতভাবেই কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে সরবরাহের ওপর তৈরি চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার আগে রিলায়েন্স ছিল ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ওয়াশিংটন দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। এরপর রিলায়েন্স আবারও ভেনেজুয়েলার তেলের বড় আমদানিকারক হিসেবে ফিরে আসে।
এই সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার জ্বালানি কেনার কারণে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যদিও বর্তমানে তা স্থগিত। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর ভারত রাশিয়ার তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতায় পরিণত হয়। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাশিয়ার মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৩৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল ভারত।
২০২৫ সালের আগস্টে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; এতে অনেক পণ্যের ওপর মোট শুল্কের হার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত এই শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও ভারতের রাশিয়ার তেল আমদানি ওয়াশিংটন ও দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তির কারণ হয়ে রয়েছে। ভারত বরাবরই বলে আসছে, দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাই তাদের অগ্রাধিকার।
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সাময়িকভাবে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামনগরে রুবিওর সফর যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ — রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা কমানো, ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানি বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া এবং জ্বালানি সহযোগিতাকে কেন্দ্রে রেখে একটি বাণিজ্য চুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়া।



