ভালুকার সাথী আক্তার থেকে কুষ্টিয়ার শিক্ষক: সমালোচনার পর গ্রেপ্তারের ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ময়মনসিংহের ভালুকার নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার ফেসবুক লাইভে এসে বলেছিলেন, বিএনপিকে ভোট দিয়েও ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে থানায় নেয় পুলিশ। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ভালুকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিডিওটি চারবার দেখেও সরকারবিরোধী কোনও বক্তব্য পাননি। যা বলেছেন, তা তাঁর বাক্স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বক্তব্য অপরাধ না হলে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন পড়ল কেন?
২৫ অক্টোবর ভালুকায় সাথী আক্তারকে আটক করে পরদিন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। স্থানীয় থানার ওসি বলেছেন, ভিডিও ঘিরে স্থানীয়দের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ওই নারীর ‘মারমুখী আচরণের’ অভিযোগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই কেন গ্রেপ্তার করা হলো, তার সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
সাথী আক্তারের ঘটনা সরকারের সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য কিংবা ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর গ্রেপ্তার ও আটকের একাধিক ঘটনার সঙ্গে নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে কুষ্টিয়ায় শিক্ষক আটক, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর গাজীপুরে তরুণকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার এবং সংসদের চিফ হুইপকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের ঘটনায় কনটেন্ট নির্মাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই-সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মাসে সাইবার সুরক্ষা আইনে ১০টি মামলায় ৩২ জনকে অভিযুক্ত এবং ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টের অভিযোগে আটজন ও অন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমালোচনার অভিযোগে তিনজনকে আটকের তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই আটকের হিসাবের সঙ্গে সাইবার আইনে গ্রেপ্তার হওয়া ১১ জনের কতটা মিল রয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে গত কয়েক মাসে ২২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর আগে ২৩ এপ্রিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অন্তত চারজন গ্রেপ্তারের ঘটনা তুলে ধরে উদ্বেগ জানায়। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের আওতায় আনার প্রবণতা আগের সরকারের সময়কার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। পুলিশ সংস্কারের পাশাপাশি অস্পষ্ট ভাষার এমন আইনি বিধান সংশোধনের আহ্বান জানায় সংস্থাটি, যেগুলো ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করা সম্ভব।
ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় ৩১ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত ছবি ফেসবুকে শেয়ারের অভিযোগে আজিজুল হককে প্রথমে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আটক করা হয়। পরে সাইবার আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগের কথা জানায় পুলিশ। ২ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অবমাননাকর পোস্টের অভিযোগে শাওন মাহমুদকে আটক করে পুলিশের কাছে তুলে দেন যুবদলের কর্মীরা। তাঁকেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৫ এপ্রিল ভোলায় জামায়াত সমর্থক বিবি সাওদা ওরফে সাওদা সুমিকে সরকারবিরোধী পোস্টের অভিযোগে ৫৪ ধারায় আটক করা হয়। দুদিন পর জামিন পান তিনি। ১৭ এপ্রিল রাজধানীতে গ্রেপ্তার হন কনটেন্ট নির্মাতা এ এম হাসান নাসিম। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় সাইবার আইনে মামলা হয়। ১৮ এপ্রিল তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২১ এপ্রিল তিনি জামিন পান।
নাসিমের মামলায় অভিযোগ শুধু কার্টুন প্রকাশের ছিল না। এজাহারের প্রকাশিত বিবরণে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং হোয়াটসঅ্যাপে স্ক্রিনশট পাঠিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইলের কথা বলা হয়। এতে সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ ও ২৭ ধারার উল্লেখ ছিল। বিষয়টি সংসদেও আলোচনায় আসে। চিফ হুইপ বলেন, কেবল কার্টুন প্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার হয়ে থাকলে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মুক্তি চান।
জুনে স্থানীয় সরকারবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলাম গ্রেপ্তার হন। বগুড়ায় দায়ের করা মামলায় মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। গাজীপুর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ২১ জুন তিনি জামিন পান। প্রতিমন্ত্রী জানান, মামলা করতে তিনি নির্দেশ বা অনুমতি দেননি।
এরপর ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে এনসিপির অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে বগুড়ায় সাইবার আইনে মামলা করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মাফতুন আহমেদ খান রুবেল। ৫ আগস্ট তাঁকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করে বগুড়ার আদালতে হাজির করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের গাছায় গ্রেপ্তার হন শিক্ষার্থী সিফাত আবদুল্লাহ। বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল নিয়ে ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে ভিডিওর জন্য নতুন মামলা না করে আগের একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
৩০ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শ্রেণিকক্ষে জাতিসংঘে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করা হয়। প্রতিবাদের মুখে তাঁকে থানায় নেওয়া হলেও ওই রাতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান গণতন্ত্রের ভিত্তি।
একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা যুবদলের নেতা এস এম রফিকুল বারী ওরফে রুবেল চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। যুবদলের দাবি, তিনি সরকার ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য করে শৃঙ্খলা ভেঙেছেন।
ঘটনাগুলোয় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৫১ ধারা, সাইবার সুরক্ষা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। ৫৪ ধারা নির্দিষ্ট শর্তে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের এবং ১৫১ ধারা সম্ভাব্য আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করলেও আইনসম্মত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রেখেছে।
মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, সরকারের সমালোচনা, ফেসবুক পোস্ট কিংবা ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের কারণে নাগরিকদের গ্রেপ্তার বা আটকের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার উদ্বেগ তৈরি করে। তাঁর ভাষ্য, কোনও বক্তব্য সরকারের জন্য অস্বস্তিকর বা বিব্রতকর হলেই তা ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় না। সাইবার আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সচিবালয়ে সাথী আক্তারের ঘটনা নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, শুধু বক্তব্যের জন্য কারও বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টিও সমর্থনযোগ্য নয়। কাউকে আদালতে হাজির করার পর সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয় উল্লেখ করে তিনি নিরপেক্ষ পুলিশি তদন্তের প্রত্যাশা জানান। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতা ও তাঁদের নীতির সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। তবে সমালোচনা আর ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপবাদ দেওয়া এক নয়।




