ইসরায়েলে ভোটগ্রহণ শেষ, এক্সিট পোলে স্পষ্ট বিজয়ী নেই: লিকুদ সামান্য এগিয়ে, বিরোধী জোটে এগিয়ে নেতানিয়াহুবিরোধীরা

ইসরায়েলে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। প্রাথমিক এক্সিট পোল অনুযায়ী কোনো স্পষ্ট বিজয়ীর আভাস মিলছে না। দেশটির প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর প্রকাশিত এক্সিট পোলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের দলের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে। তবে প্রধানত আরব দুটি দলসহ নেতানিয়াহুবিরোধী জোট প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মিত্রদের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বলে এক্সিট পোলগুলোতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। ভোটগ্রহণ শেষের দুই ঘণ্টা আগে রাত ৮টা পর্যন্ত যোগ্য ভোটারদের ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন, যা ১৯৮৮ সালের পর ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ হার।
কোনো দলই নিরঙ্কুশ জয় পাবে বলে আশা করা হচ্ছে না। ফলে নির্বাচনটি পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে, তা নির্ধারণের প্রথম ধাপ মাত্র। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় জোট সরকার গঠন করতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
ইসরায়েলে হাতে ভোট গণনা করা হয়। দেশজুড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট স্লিপ গণনা করা হয় এবং ক্যামেরা হাতে নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা গণনা পর্যবেক্ষণ করেন। হাতে গণনা শেষ হলে কাগজের ফলাফল আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়, যেখানে তা ইলেকট্রনিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এক্সিট পোল প্রাথমিক ধারণা দিলেও ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনে এর নির্ভুলতার ইতিহাস অনিয়মিত বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আরব নাগরিকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বিশেষভাবে বেশি ছিল। আরব নাগরিকেরা ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিকেলের শেষভাগে, ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই, কিছু আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ শহরে উপস্থিতি ২০২২ সালের গত নির্বাচনের মোট উপস্থিতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
ওই শহরগুলোতে উচ্চ উপস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘নির্বাচন চুরির চেষ্টার’ অভিযোগ তোলেন এবং ডানপন্থী ঘাঁটিকে ভোট দিতে বারবার বর্ণবাদী আবেদন ব্যবহার করেন। মঙ্গলবার তাঁর লিকুদ পার্টির ভোটের সময় বাড়ানোর চেষ্টা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার বলেছেন, ব্যাপক অনিয়মের কোনো আভাস পাওয়া যায়নি।
এই নির্বাচন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ওই হামলা ছিল হলোকাস্টের পর ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন এবং তা তিন বছরের যুদ্ধের সূত্রপাত করে, যাতে গাজা বহুলাংশে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং এর প্রায় সব জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়।
ভোটারদের সামনে ছিল দুটি জোটের সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন; তাঁর জোট জাতীয়তাবাদী ও অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের নিয়ে গঠিত। এর বিপরীতে রয়েছে ইহুদি বিরোধী দলগুলোর আদর্শগতভাবে বৈচিত্র্যময় একটি গোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, যাঁর ছেলে গাজা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোও নেতানিয়াহুর সরকারের তীব্র বিরোধী।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী নেতারা ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর জবাবদিহি দাবি করেছেন। তাঁরা বিদেশে ইসরায়েলের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি চরমপন্থী সহিংসতা দমনও রয়েছে। নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের হামলা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি প্রতিহত করেছেন।
নির্বাচনের দিন সকালে শুরু হয় ৭ অক্টোবরে নিহতদের স্বজনদের কর্মসূচি দিয়ে। তেল আবিবের ‘হোস্টেজেস স্কয়ার’ নামে পরিচিত চত্বরে তাঁরা ভোর ৬টা ২৯ মিনিটে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন — তিন বছর আগে হামাসের আক্রমণ শুরুর মুহূর্ত। প্রিয়জনের ছবি হাতে তাঁরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও সেই দিনের কথা মনে রাখার আহ্বান জানান। দলটি বলেছে, ‘গণহত্যার তিন বছর পর আমাদের প্রিয়জনেরা আজ ভোট দেবেন না। বেরিয়ে গিয়ে ভোট দিন — ব্যালট বাক্সে তাঁদের স্মরণ করুন। এই নির্বাচন সেই বিষয়েই।’ তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি হামলা নিয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন।
আইজেনকোট দিন শুরু করেন ৭ অক্টোবরে আক্রান্ত সম্প্রদায়গুলো পরিদর্শন করে। তিনি বলেন, ‘সরকারে কারও দায়িত্ববোধের ছিটেফোঁটা থাকলে তিনি সকাল এখানে শুরু করতেন।’ উল্লসিত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সব ইসরায়েলিকে ‘ইসরায়েলের দেখা সবচেয়ে খারাপ সরকার’ সরাতে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিদেশে বসবাসকারী হাজার হাজার ইসরায়েলিও ভোট দিতে দেশে ফিরেছেন, কারণ নির্বাচনী আইনে কেবল সশরীরে ভোট দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। দ্বিদলীয় ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগ ফিরতে ইচ্ছুকদের সহায়তা করেছে। মনিকা মোরিয়া (৫৮) ও তাঁর স্বামী রন বার্সেলোনা থেকে তেল আবিবে উড়ে আসেন এবং ট্রেনে করে একটি কিবুৎজে গিয়ে তিনি ইহুদি ইসরায়েলি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলকে ভোট দেন। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে ইসরায়েল পথ হারিয়েছে; গভীর বিভাজন ও ঘৃণা রয়েছে, যা সারানো খুব কঠিন হবে।’ নিউইয়র্কে পিএইচডি করা কবি মিজরাহি (৩৫) মাত্র কয়েক দিনের জন্য ফিরতে ১ হাজার ৬০০ ডলারের বেশি খরচ করেছেন। ২০২২ সালের গত নির্বাচনের পর থেকে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানিয়ে তাঁকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, অন্য কেউ ইসরায়েলের জন্য ‘ভুল নেতা’ হবেন। বিশ্লেষকেরা অবশ্য সন্দিহান ছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই হস্তক্ষেপ অনেক ভোটারকে প্রভাবিত করবে। ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় না থাকলে দেশ ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।




