তিন শহরের জরিপ: ১০ পরিবারের প্রায় ৭টিতেই ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া, সবচেয়ে ঝুঁকিতে নগরের শিশুরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তিনটি শহরাঞ্চলে মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে চালানো এক মাঠ জরিপে দেখা গেছে, অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর ৬৯ শতাংশ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার ভবনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে নগরের শিশুস্বাস্থ্য: সংকট ও সমস্যা সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক উপস্থাপনা ও নাগরিক সংলাপে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। আয়োজক ছিল চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও পরিবেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্ক’ (ইআইআরএন)-এর প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
জরিপে মশাবাহিত জ্বরের পাশাপাশি ১৮ শতাংশ পরিবার চর্মরোগ, ১০ শতাংশ পানিবাহিত রোগ এবং ৩ দশমিক ৫ শতাংশ শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভোগার কথা জানিয়েছে।
জরিপ চালানো হয়েছে ঢাকা মহানগরের মিরপুর ৬, হাজারীবাগ, বৌবাজার, বড়াইখালী ও বোটঘাট বস্তিতে; রাজশাহী সিটির নমোভদ্র বস্তি ও বুধপাড়া বস্তিতে এবং সাতক্ষীরা পৌরসভার রহমতপুর কলোনি ও বদ্দিপুর কলোনিতে।
জলবায়ুজনিত চাপের মধ্যে তাপপ্রবাহকে সবচেয়ে বেশি অনুভূত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে ৫১ দশমিক ৮৭ শতাংশ পরিবার। জলাবদ্ধতার কথা বলেছে ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ, নদীভাঙনের কথা ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ এবং লবণাক্ততার কথা শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ পরিবার।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার ভাগাভাগি করে শৌচাগার ব্যবহার করে। মাত্র ৫৫ শতাংশ পরিবার পানীয় জল হিসেবে নলকূপের পানি ব্যবহার করে। ঘনবসতিতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে উপস্থাপনায় বলা হয়।
দুর্যোগের পুনরাবৃত্তিও উদ্বেগজনক। ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ পরিবার তিনবারের বেশি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে, ১৯ শতাংশ দুই থেকে তিনবার এবং ৮ শতাংশ একবার এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছে। মাত্র ৩ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা এ ধরনের দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যায়নি।
২০২৫ সালের এই মাঠ জরিপে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তীব্র গরমে শিশুদের দ্রুত পানিশূন্যতা ও তাপজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে এবং দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, নগরায়ণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ধূলিকণা ও ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শ এবং তুলনামূলক কম রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে শিশুরা বেশি সংবেদনশীল; মায়ের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলেও শিশুর স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বড় হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার দিকে না ঝুঁকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করার কথা বলেন।



