সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য, পানি ও মাটিতে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। উজানের নদী, বঙ্গোপসাগর ও বনসংলগ্ন জনপদ থেকে আসা প্লাস্টিক জোয়ারের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে বনের গভীরে। সৈকত, চর ও ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলের চারপাশে জমছে পলিথিন, নাইলন জাল ও বোতলসহ নানা বর্জ্য।
কটকা, কচিখালী, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধার মানিকসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় সৈকত থেকে বনের অভ্যন্তর পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সেখানে কসমেটিকসের প্যাকেট, ভিন্ন পুরুত্বের পলিথিন, স্যান্ডেল, বস্তা, জেলেদের ফেলে দেওয়া নাইলন জাল, কীটনাশকের খালি বোতল, জালের ভাসমান ড্রাম ও কর্কশিট পড়ে আছে। ডিমের চরে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় সাগরতীরের উঁচু জায়গায় কয়েক টন প্লাস্টিকসামগ্রী দেখা গেছে।
কটকা ও কচিখালী থেকে বিপুল বর্জ্য অপসারণ করা হলেও সৈকতে এখনো বিপুল বর্জ্য রয়ে গেছে। পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগ বিভিন্ন সময় প্লাস্টিক সংগ্রহ করে বাগেরহাট ও খুলনায় ডাম্পিং করে, তবে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে জমা হওয়া বর্জ্যের তুলনায় এই কার্যক্রম অপ্রতুল বলে জানা গেছে।
বন বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্জ্য আসার প্রথম উৎস উজানের নদী। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার শহরাঞ্চলের বর্জ্য পশুর, শিবসা, শেলা, বলেশ্বর, কপোতাক্ষ, ভোলা ও খোলপেটুয়াসহ বিভিন্ন নদী-খাল দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে এবং দৈনিক দুবার জোয়ার-ভাটায় বনের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় উৎস বঙ্গোপসাগর। ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন শহর এবং পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী দিয়ে বিপুল বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমুদ্রগামী জেলে, পর্যটক ও নৌযানের ফেলে দেওয়া নাইলন জাল, ড্রাম, কর্কশিট ও বোতল। সমুদ্রের ফানেল আকৃতির ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঢেউ-স্রোতের প্রভাবে এসব বর্জ্য সুন্দরবনের সৈকত ও চরে এসে জমে।
তৃতীয় উৎস বনসংলগ্ন এলাকা। বনসংলগ্ন বাজার-বন্দর, মৎস্য আড়ত, নৌঘাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বসতবাড়ির বর্জ্যও স্থানীয় নদী-খাল দিয়ে বনে প্রবেশ করে।
সুন্দরবনে বছরে কত টন প্লাস্টিক জমা হয়, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব বা গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান নেই। ২০১৭ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা থেকে বছরে প্রায় ৭২ হাজার ৮৪৫ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর মডেলভিত্তিক তথ্য দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ‘ফ্রনটিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাতেও ওই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ২০২০ থেকে ২০২২ সালে সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের নমুনায় প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২ দশমিক ২২টি এবং প্রতি কেজি মাটিতে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, উজানের নদী ও সমুদ্র থেকে প্লাস্টিক অপসারণ করা গেলে দূষণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, প্লাস্টিক গাছের বৃদ্ধি, বীজের অঙ্কুরোদ্গমন এবং জলজ প্রাণীর প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বাজেট ও জনবলসংকটের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বনে প্লাস্টিক নেওয়া বা ফেলা নিষিদ্ধ এবং বনপ্রহরীরা টহল ও তল্লাশি চালান। তবে নদী ও সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন, এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।




