বাইডেন আমলের মিথেন বিধি বাতিলের ঘোষণা ট্রাম্পের, সমালোচকদের জলবায়ু ঝুঁকির সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেন আমলের মিথেন নির্গমন সংক্রান্ত বিধিমালা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। টেক্সাসের লাবকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসন তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের মিথেন লিকের জন্য দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত বিধিগুলো ‘বাতিল’ করছে।
ট্রাম্প বলেন, এই পরিবর্তনে ভোক্তা ও জ্বালানি উৎপাদকদের ৪৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে এবং অতিরিক্ত ২১ কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলন সম্ভব হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০ দিনের পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের সমান। সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেনের ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় মিথেন বিধিমালা বাতিল করছি, যাতে ভোক্তা ও জ্বালানি উৎপাদকদের সাশ্রয় হয়।’ তিনি দাবি করেন, ছোট তেল ও গ্যাস পরিচালকদের ওপর এই বিধি ‘পঙ্গু করে দেওয়ার মতো’ চাপ তৈরি করেছিল এবং দাম বাড়িয়েছিল।
পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসক লি জেলডিন ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ক্লিন এয়ার অ্যাক্টের আওতায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ‘যুদ্ধ’ শেষ করা হচ্ছে। ইপিএর হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ভোক্তা ও ব্যবসায়, বিশেষ করে প্রান্তিক কূপ পরিচালনাকারী ছোট ব্যবসার ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ বাঁচাবে এবং আনুমানিক ২১ কোটি ব্যারেল অতিরিক্ত তেল ও ১ দশমিক ৪১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করবে।
এই পদক্ষেপের পেছনে দেশীয় খনন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছেন ট্রাম্প।
২০২৪ সালের মিথেন বিধিতে তেল ও গ্যাস পরিচালকদের মিথেন এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উদ্বায়ী জৈব যৌগের লিক, ফ্লেয়ারিং ও ভেন্টিং দূর করা বা কমিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা ছিল। বিদ্যমান তেল ও গ্যাস স্থাপনা থেকে মিথেন নির্গমন সীমিত করতে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের প্রথম দেশব্যাপী বিধি। এর আগে ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের বিধি শুধু নতুন ও পরিবর্তিত উৎসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। ২০২৪ সালের বিধির ‘সুপার এমিটার’ কর্মসূচির আওতায় ইপিএ-অনুমোদিত দূর-সংবেদন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষের শনাক্ত করা বড় লিকের তদন্ত করতে হতো কোম্পানিগুলোকে।
২০২৫ সালের মার্চে ইপিএ প্রশাসক জেলডিন ঘোষণা দেন, বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের বিধিগুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘জ্বালানি আধিপত্য উন্মোচন’ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নির্গমন হ্রাসে নেতৃত্বের পথে বাধা না হয়।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত জলবায়ুর জন্য বিপজ্জনক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস খাত থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি মিথেন নির্গত হয়েছে। মিথেন বর্তমান উষ্ণায়নের অন্তত এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী।
তেল ও গ্যাস পর্যবেক্ষক সংস্থা ফিল্ডনোটসের তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথি অনুযায়ী, কিছু তেল ও গ্যাস নির্বাহী প্রকাশ্যে এই বিধির পক্ষে কথা বললেও শিল্প সংগঠন ও করপোরেশনগুলো পর্দার আড়ালে বিধি দুর্বল করতে কাজ করেছে। ফিল্ডনোটসের গবেষক জুলিয়া কেইন বলেন, তেল ও গ্যাস শিল্প নিজেকে ‘সদিচ্ছাসম্পন্ন’ অংশীদার দাবি করলেও বারবার পর্দার আড়ালে বিধি বিলম্বিত ও দুর্বল করেছে। তাঁদের নথি অনুযায়ী, বর্তমান প্রশাসনের প্রথম বছরে শিল্প সংগঠন ও কোম্পানিগুলো মিথেন বিধি নিয়ে ইপিএর সঙ্গে অন্তত ৩৮ বার বৈঠক করেছে।
কেইন বলেন, শিল্প সংগঠনগুলো নিজেরাই ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে পাওয়া সুযোগে অবাক হয়েছে। তিনি উদাহরণ দেন, ইন্ডিপেনডেন্ট পেট্রোলিয়াম অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার নির্বাহী লি ফুলার এক কনফারেন্স কলে ইপিএ কর্মীদের সঙ্গে বৈঠককে তাঁদের দেখা ‘সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈঠকগুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, কারণ হঠাৎ করেই তাঁরা কথা বলতে এবং বছরের পর বছর ধরে চাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছিলেন।
একই দিনের শুরুতে করপাস ক্রিস্টিতে আরেক সমাবেশে ট্রাম্প কন্টিনেন্টাল রিসোর্সেসের প্রতিষ্ঠাতা হ্যারল্ড হ্যামকে দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত বলে পরিচয় করিয়ে দেন। গত এপ্রিলে কন্টিনেন্টাল রিসোর্সেস ইপিএকে চিঠি লিখে মিথেন বিধির সেই অংশের বিরোধিতা করেছিল, যেখানে সংশ্লিষ্ট গ্যাসের নিয়মিত ফ্লেয়ারিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ইপিএ তেল ও গ্যাস বিধি প্রয়োগ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পরিচালকেরা ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাস লিক, ভেন্ট বা ফ্লেয়ার করেছে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও প্রধান আইনজীবী রোজালি উইন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন নির্গমনের জন্য দায়ী সবচেয়ে বড় খাতগুলোতে জলবায়ু দূষণ মোকাবিলায় ফেডারেল সরকারের সক্ষমতা খর্ব করতে চাইছে।
উইন বলেন, প্রশাসন শিল্পের সবচেয়ে খারাপ দূষণকারীদের আমেরিকান ভোক্তাদের পেছনে ফেলে আরও বেশি অর্থ উপার্জন করতে দিচ্ছে, আর একই সঙ্গে জ্বালানি অপচয় করছে।




