যশোরে সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার, হাঁটতে পারছে নড়াইলের কিশোর ইকরামুল
ফুটবল খেলতে গিয়ে হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত পেয়েছিল ১৬ বছরের কিশোর ইকরামুল মোল্লা। এক মাস ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় সে চিকিৎসার জন্য আসে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, সুস্থ হতে তার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
বেসরকারি ক্লিনিকে এই অস্ত্রোপচারের খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। ইকরামুলের বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার তাড়াশি গ্রামে। তার বাবা বশির মোল্লা এক চোখে দেখতে পান না, আর মাত্র ৮ শতক জমির ওপর বসতভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো উল্লেখযোগ্য সহায়-সম্বল নেই। ফলে এই অর্থ জোগাড় করা পরিবারটির পক্ষে ছিল প্রায় অসম্ভব।
এক মাস ধরে ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় ছেলেকে নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসেন মা সালমা বেগম। পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত লেগেছে এবং অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগবে শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন সালমা বেগম।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়ান হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. এস কে রাজিবুল ইসলাম। ইকরামুলের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নেন।
গত ৭ অক্টোবর যশোর জেনারেল হাসপাতালেই ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে অ্যাডভান্সড আর্থ্রোস্কোপিক এসিএল অস্ত্রোপচার করেন ডা. রাজিবুল ইসলাম। অস্ত্রোপচারটি হাসপাতালে বিনা খরচে সম্পন্ন হয়, তবে অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ পরিবারকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বহন করতে হয়েছে।
ডা. রাজিবুল ইসলামের দাবি, যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইতিহাসে এ ধরনের অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। তিনি বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়মিত রোগী দেখতে গিয়ে তিনি ইকরামুলের পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জানতে পারেন, এরপর পরিবারকে জানান অস্ত্রোপচার যশোর জেনারেল হাসপাতালেই করা হবে। পরিবার রাজি হলে ৭ অক্টোবর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটাই সুস্থ ইকরামুল। তার পায়ের ব্যথা নেই বললেই চলে, বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে সে এবং ধীরে ধীরে হাঁটাচলাও করতে পারছে। ডা. রাজিবুল ইসলাম নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখছেন। ইকরামুল বলেছে, ‘আমার পায়ে এখন আর ব্যথা নেই। মোটামুটিভাবে হাঁটতে পারছি।’
ডা. এস কে রাজিবুল ইসলাম অর্থোপেডিক সার্জারির বিশেষজ্ঞ। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তার যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে ডি-অর্থ, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ও এফসিপিএস (অর্থোপেডিক সার্জারি)। সম্প্রতি তিনি ভারতের দিল্লি থেকে হাঁটুর লিগামেন্টের আর্থ্রোস্কোপিক অস্ত্রোপচার বিষয়ে ফেলোশিপ অর্জন করেছেন।
যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন শাফায়াত বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় জনবলেরও সংকট রয়েছে।
হুসাইন শাফায়াত আরও বলেন, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে। তার জানামতে, যশোর জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম, এবং তারা চান উন্নত ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা সরকারি হাসপাতালেই নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হোক, যাতে সাধারণ মানুষকে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে না হয়।




