জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপ দিন
জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ যখন তার উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলছিল, তখন জাপান পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের শিল্প খাত গড়ে তুলতে, নতুন কর্মসংস্থান ও সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং একসঙ্গে এগিয়ে চলতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, লক্ষ্য সুস্পষ্ট — দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করা, দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দুই দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো) এবং দ্য জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এই ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। ফোরামে প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্য দেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যেসব দেশ প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের অন্যতম। সেই সময় থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চান। দেশের ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। জনগোষ্ঠীর মধ্যম বয়স মাত্র ২৭ বছর। এর সঙ্গে রয়েছে তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য কর্মশক্তি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান বিকাশের ফলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বার্ষিক জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে এ বছর বাংলাদেশ ও জাপান একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন। এটি বাংলাদেশের কোনো দেশের সঙ্গে সম্পাদিত এ ধরনের প্রথম চুক্তি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্বের সূচনা হয়েছিল উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। এখন সময় এসেছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় জাপানের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। একইভাবে ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্যও বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ভোগ করবে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ, সেবা ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি সহজতর ও প্রগতিশীল নিয়ম চালুর ফলে উভয় দেশের বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন বলে তিনি বলেন। জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ শুরু হচ্ছে এবং এটি অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলেন, যেখানে বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন, এ ভাষায় কথা বলবেন এবং বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রাখবেন।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা পূরণে সম্ভাবনা অনুসন্ধান এবং জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষ্য হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবননির্ভর একটি আইটি পার্ক গড়ে তোলা। এ উদ্যোগে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা হবে। মহাকাশপ্রযুক্তি সহযোগিতারও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি বলেন; বাংলাদেশ তার মহাকাশ-সংশ্লিষ্ট সক্ষমতা জোরদার করতে আগ্রহী এবং মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ এ ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পারস্পরিকভাবে লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান করতে আগ্রহী।
উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য দেশের শহর ও গ্রাম, কারখানা ও সমুদ্রবন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। লক্ষ্য এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানুষকে নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং সারা দেশে পণ্য পরিবহনকে আরও দ্রুত ও দক্ষ করে তুলবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নেটওয়ার্ক এবং ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করে উচ্চগতির রেলব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে জাপান বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। তাই দেশব্যাপী উড়াল মহাসড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের একটি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরপর বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাপানের সহযোগিতা স্বাগত জানানো হবে।




