চীনে শিশুদের ছাড়িয়ে গেল প্রবীণদের সংখ্যা, নির্ভরশীল প্রবীণদের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে
চীনে কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের অনুপাত প্রথমবারের মতো শিশুদের অনুপাতকে ছাড়িয়ে গেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই অনুপাত বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শিশুদের ক্ষেত্রে অনুপাতটি ছিল ২২ শতাংশ।
দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, চীনে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ২২ কোটি ৩০ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে ১৪ বছর বা তার কম বয়সি শিশুর সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ। ফলে মোট সংখ্যার হিসাবেও প্রবীণেরা শিশুদের ছাড়িয়ে গেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্মক্ষম মানুষ কমে যাওয়া, পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সামনে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। জনসংখ্যার এই বদল দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিয়েটেল-বাস্টেন বলেছেন, এই পরিবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর মতে, এর অর্থ হতে পারে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে চলে যাবে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক মু ঝেং মনে করেন, এই প্রবণতা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাঁর মতে, এতে প্রবৃদ্ধি সীমিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
মু ঝেং আরও বলেন, এক সন্তান নীতি জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ওই নীতির কারণে পরিবারে প্রবীণ আত্মীয়দের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো তরুণ মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। একই সঙ্গে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার হার বাড়ার মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চীনে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত এক সন্তান নীতি কার্যকর ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। সরকারের অনুমান অনুযায়ী, ওই নীতির ফলে প্রায় ৪০ কোটি শিশুর জন্ম ঠেকানো গিয়েছিল, যদিও এই হিসাবের যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণকেও জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও বার্ধক্য বাড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনসংখ্যার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীন কয়েক বছর ধরে তরুণ প্রজন্মকে বিয়ে করতে এবং দম্পতিদের আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহ দিয়ে আসছে। তবে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সেই উদ্যোগে খুব বেশি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বার্ধক্যের এই ধারা পরিবারগুলোর ব্যয়, পেনশনব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমলে উৎপাদন ও শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে, আর প্রবীণদের পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।


