ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেন নেতানিয়াহু, ফিলিস্তিনি দলগুলোর উত্থানে ঝুলে গেল সরকার গঠন

ইসরায়েলের নির্বাচনের ভোট গণনা বুধবার এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর শাসক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। এখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিরোধী ইহুদি দলগুলো ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে যৌথ মোর্চা গড়তে রাজি হয় কি না তার ওপর, কারণ মঙ্গলবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মোট ভোটের ৮৬ শতাংশ গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, দুটি ইহুদি জোটের কোনোটিই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি নেসেট আসন পাচ্ছে না। বাকি প্রায় ১৪ শতাংশ ভোট মূলত মোতায়েন সেনা ও অন্যান্য অনুপস্থিত ভোটারদের, যেগুলোর গণনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিরোধী জোটের নেতা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকোট রাতভর ‘ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতা’র জন্য আগাম বিজয় ঘোষণা করে এমন বিস্তৃত জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। তবে গণনা এগোতে থাকায় প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে আইজেনকোটের জোটের সামান্য এগিয়ে থাকার চিত্র নিয়ে সন্দেহ বাড়ে, কারণ নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে যেতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে আইজেনকোট ও তাঁর মিত্রদের সামনে স্পষ্ট দুটি পথ: হয় রেকর্ড ১৬ থেকে ১৯টি আসন পেতে যাওয়া আরব ইসরায়েলি দলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা, নয়তো নতুন নির্বাচন বা ঐক্য সরকারের আকারে নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক জীবনরেখা দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলের কৃতিত্ব নিজের সমর্থনকে দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর সমর্থন ঘোষণা বের হওয়ার পর তা নেতানিয়াহুকে অনেক সাহায্য করেছে, এবং ফলাফল অচলাবস্থা বা নেতানিয়াহুর জয়ের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
আইজেনকোটের ‘পরিবর্তন’ জোটের ছোট অংশীদার মধ্য-বাম ডেমোক্র্যাটদের নেতা ইয়াইর গোলান আইজেনকোটকে দুটি ফিলিস্তিনি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম (ইউনাইটেড আরব লিস্ট)—এর সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ভয় পাওয়া বন্ধ না করলে এবং বর্ণবাদের অবসান না ঘটালে তাঁদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এবং আরব নাগরিকদের ভোট মুছে ফেলার চেষ্টা মানে নেতানিয়াহুর কাছে আত্মসমর্পণ।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন বলেন, তাঁদের শক্তিশালী ফলের অর্থ হলো কোনো রাজনৈতিক হিসাবেই তাঁদের উপেক্ষা করা যাবে না। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর সরকার, বিশেষ করে উগ্র জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, প্রতিটি আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে, এবং তাঁরা নেতানিয়াহু, বেন-গভির ও স্মোত্রিচের সরকারকে বিদায় করার পথ তৈরি করতে প্রস্তুত।
সব ভোট গণনা শেষ হতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে, অনুপস্থিত ভোটগুলোই সবার শেষে গণনা হবে, যার বেশিরভাগই মোতায়েন সেনাদের। সেনাদের ভোট সাধারণত ডানপন্থীদের দিকে ঝুঁকে, তবে এবার অনেক বয়স্ক ও মধ্যপন্থী রিজার্ভ সেনা সক্রিয় দায়িত্বে থাকায় সেই চিত্র জটিল হতে পারে।
সব ভোট গণনা হয়ে গেলে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগ কোনো এক দলনেতাকে সরকার গঠনের জন্য ছয় সপ্তাহ সময় দেবেন। প্রথমজন ব্যর্থ হলে সুযোগ যাবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। বুধবার হার্জোগ সব দলকে নতুন সরকারি জোট গড়ার চেষ্টায় ‘খোলা মন’ রাখার আহ্বান জানান এবং বলেন, আরেক দফা নির্বাচন এড়াতে সবকিছু করতে হবে। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।
মঙ্গলবারের এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইসরায়েলে আগেও বারবার ভোট ডেকে এনেছে—২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচটি নির্বাচন হয়।
নির্বাচনটিকে ব্যাপকভাবে ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর ওপর গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী, গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি দুর্নীতির মামলায় জড়িত। প্রচারের শেষ দিকে, ভোট শুরুর আগের সন্ধ্যায়, তিনি তেল আবিবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি ছবি পোস্ট করেন।




