কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের নামে ভুয়া নিয়োগে টাকা হাতানোর অভিযোগ: হিসাবরক্ষক মাসুম রেজাকে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ

দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে জেরবার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে এবার আউটসোর্সিংয়ের নামে ভুয়া নিয়োগ দিয়ে টাকা হাতানোর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা প্রকল্প পরিচালক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন।
অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ অক্টোবর ডিএই কর্তৃপক্ষ তদন্তের তাগিদ দিয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন প্রকল্পে আউটসোর্সিং ও দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজার বিরুদ্ধে। তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
ডিএইর উপপরিচালক মো. মুরাদুল হাসান বলেন, ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এ প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আসুক।’
এর আগে ডিএইর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন সৌমিক আরাফাত নামে এক ভুক্তভোগী। অভিযোগে বলা হয়, হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা ও প্রকল্প পরিচালকের গাড়িচালক শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়েছে। সৌমিক আরাফাতকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়ার জন্য মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী গত ১৩ মে গাড়িচালক শফিকের স্ত্রী আকলিমা বেগমের সোনালী ব্যাংকের হিসাবে ১ লাখ টাকা পাঠান সৌমিক আরাফাত।
অভিযোগের বিষয়ে হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা বলেন, ‘পিডির কথায় নিয়োগের বিষয়ে তারা আমার কাছে আসছিল। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, ওই টাকা ফেরত দিয়েছি।’ খামারবাড়িতে টাকা ছাড়া কোনো নিয়োগ হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পটুয়াখালীর বাউফলের জহিরুল ইসলামও গাড়িচালক শফিককে অর্থ দিয়ে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ পাওয়ার দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, গাড়িচালক শফিক চাকরি দেওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেন। নিয়োগপত্র ছাড়াই ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রকল্প কার্যালয়ে কর্মরত তিনি, কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো বেতন-ভাতা ও নিয়োগপত্র পাননি। প্রকল্প পরিচালকের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও চাকরির জন্য দেওয়া ২ লাখ টাকা ফেরত পাননি তিনি।
কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল বিগত সরকার। প্রকল্পটির বাজেট ছিল ৩ হাজার কোটি টাকা। মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর।
শেষ বছরে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কারণে প্রকল্পে অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্পের অবশিষ্ট ৪০০ কোটি টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত থাকায় সাবেক প্রকল্প পরিচালকসহ আটজন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র চার মাস আগে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান মঞ্জুর-উল-আলম। প্রকল্পের মেয়াদ আরেক বছর বাড়িয়ে অবশিষ্ট টাকা ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়েছিল, কিন্তু পরে আর মেয়াদ বাড়ানো হয়নি এবং কার্যক্রমও শেষ করা হয়নি।
এই স্থবিরতার মধ্যেই ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই নিয়ম ভেঙে দৈনিক যুগান্তর ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় আউটসোর্সিংয়ে কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন প্রকল্প পরিচালক। ৫ লাখ টাকা জামানত দিয়ে কর্মী নিয়োগের কাজ পায় আয়াত সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি। কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কোম্পানিটি চলতি বছর একাধিকবার এই প্রকল্পে ৭৭ জন কর্মী নিয়োগের জন্য প্রচারণা চালায়, যেখানে আকর্ষণীয় বেতন ও বছরে তিনটি উৎসব ভাতার কথা বলা হয়। যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির ফেসবুকে দেওয়া নম্বরে মো. উজ্জ্বল পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ‘কোম্পানির মালিক লেলিন সাহেব এসব জানেন।’
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনের পর এই প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রশাসনিক আদেশ হয়নি। সে কারণে লোক নিয়োগের জন্য কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া বা অর্থ লেনদেন করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় লাগে, তাই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আগেই আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় আমরা দরপত্র আহ্বান করেছিলাম।’
জানা গেছে, ১৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না প্রকল্পটির ৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী; ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বেতন বন্ধ রয়েছে। ১৯ অক্টোবর রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে প্রকল্পটির দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, কর্মীরা কর্মহীন বসে আছেন। দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় বিশেষ নিরীক্ষা চলছে। প্রকল্প পরিচালকের কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেছেন, মঞ্জুর-উল-আলমের চাকরি শেষ হয়েছে ২৩ আগস্ট; চাকরি শেষ হলেও তিনি তালা মেরে কক্ষ দখলে রেখেছিলেন, পরে এক ডিপিডির নেতৃত্বে সেই তালা ভেঙে কক্ষে নতুন তালা লাগানো হয়।
কক্ষ দখলের অভিযোগের বিষয়ে মঞ্জুর-উল-আলম বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিইনি। এখনো ওই কক্ষে আমার ফাইলপত্র আছে।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি নিয়ে অনেক দুর্নাম রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগে যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিচার চলমান রয়েছে। স্বচ্ছতার বিষয়ে আমাদের অবস্থান কঠোর।’




