আজ ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনের ভোট: ১৮৫ কেন্দ্রে ৫ লাখ ১৬ হাজার ভোটার, আগের দিন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দুই প্রধান প্রার্থীর

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ভোটের আগের দিন বুধবার নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন দুই প্রধান প্রার্থী—জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন ও বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন। আজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এবং এ আসনে মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ১১৩টি, নবগঠিত রুহিয়া উপজেলায় ৩৩টি এবং ভুল্লী উপজেলায় ৩৯টি কেন্দ্র।
এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ২৮৭ জন।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছেন এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চান। নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রশাসনের ভূমিকার ওপর এখনো তাদের আস্থা রয়েছে। তবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব কারণে ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ভোটার উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেলাওয়ার হোসেন। তার মতে, উপনির্বাচন হওয়ায় এলাকার বাইরে অবস্থানরত অনেক ভোটারের আগ্রহ কম থাকতে পারে। এর সঙ্গে হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় ভোটের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে—বিএনপির এমন অভিযোগের জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এ অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপদে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব ভোটারকে নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াত প্রার্থীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বুধবার রাতে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মির্জা ফয়সল আমীন। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। তার দাবি, ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা একের পর এক অভিযোগ তুলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন এবং এসব অভিযোগের কয়েকটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, কখনো মিথ্যাচার, আবার কখনো হামলা ও হুমকির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। ভোটারদের টাকা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। বিএনপি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই। বরং জামায়াতের টাকা দেওয়ার অনেক প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপির এই প্রার্থী।
নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার বিষয়ে মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ফলাফল যা-ই হোক, তিনি তা মেনে নেবেন। তার মতে, ফলাফল মেনে না নেওয়ার অর্থ গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস না করা; গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সব শ্রেণি-পেশার ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন।
অপরদিকে দেলাওয়ার হোসেন নির্বাচনকে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব—আজকের ভোটের মাধ্যমে প্রশাসনকে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দায়িত্ব নিতে হবে। দুই সংবাদ সম্মেলনেই দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রার্থী তালিকার ইতিহাস অনুযায়ী, গত ২৯ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এই উপনির্বাচনে ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন ও মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ, জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন, হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম, মো. আবদুল আলীম নিজামী এবং হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক। তবে ৫ অক্টোবর দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ফলে নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী রয়েছেন পাঁচজন, যাদের মধ্যে মির্জা ফয়সল আমীন ও দেলাওয়ার হোসেন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
আসনটি শূন্য হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কারণে। গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে ২৫৫ ভোটে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কারণে ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হয় এবং পরে এ আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়।




