সঞ্চয়পত্র থাকলে আয়কর রিটার্নে যেসব সুবিধা মেলে, যেভাবে তথ্য দিতে হয় ই-রিটার্নে

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার পাশাপাশি আয়কর রিটার্নেও কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কেটে রাখা কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে এ সুবিধা পেতে বিনিয়োগের অর্থ, অর্জিত মুনাফা ও উৎসে কর্তিত করের তথ্য সঠিকভাবে রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেই যে সব ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যাবে কিংবা করের দায় পুরোপুরি মিটে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ, মুনাফা ও উৎসে করের তথ্য দেওয়ার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এসব তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, কোন ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যেতে পারে এবং মুনাফার ওপর কেটে রাখা কর কীভাবে সমন্বয় করা যাবে, তা জানা জরুরি।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকলে সাধারণভাবে মুনাফার ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হতে পারে।
উৎসে কর কেটে রাখার পর রিটার্নে মোট করদায় হিসাব করে আগে পরিশোধ করা কর সমন্বয় করা যায়। ফলে করদাতার প্রকৃত করদায় অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে, আবার প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত কর পরিশোধের ঝুঁকিও কমতে পারে। উৎসে করের হার ও চূড়ান্ত করদায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন এবং প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের পুরো অর্থ করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া হয় না; আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতিতে কর রেয়াত হিসাব করা হয়।
এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের সঞ্চয়পত্রে কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, বিনিয়োগটি সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কর রেয়াতযোগ্য কি না এবং করদাতার মোট আয় ও করদায়ের পরিমাণ কত — এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। করদাতার করদায় না থাকলে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের আর্থিক সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে। আবার কর রেয়াত হিসাব করার পর করদায় কমে এলেও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর দিতে হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রের মূল বিনিয়োগ এবং সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা রিটার্নের আলাদা অংশে দেখাতে হবে। মূল বিনিয়োগ করদাতার সম্পদ হিসেবে এবং মুনাফা আয় হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। ই-রিটার্নের ‘অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটিস’ অংশে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের তথ্য দিতে হবে, আর মুনাফা দেখাতে হবে ‘ইনকাম ফ্রম ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসেটস’ অংশে।
অনলাইনে কেনা সঞ্চয়পত্রের তথ্য ই-রিটার্নের ‘ইমপোর্ট ফ্রম এনএসডি’ অপশনের মাধ্যমে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে আমদানি করা তথ্য সঠিক কি না, তা যাচাই করে নিতে হবে। যেসব সঞ্চয়পত্রের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য ম্যানুয়ালি দিতে হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটা হয়ে থাকলে সেই তথ্যও রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। এ জন্য ই-রিটার্নের ‘ট্যাক্স অ্যান্ড পেমেন্ট’ অংশে গিয়ে ‘আপডেট ট্যাক্স পেমেন্ট স্ট্যাটাস’ অপশন থেকে ‘ই-রিটার্ন লেজার’ খুলতে হবে। এরপর ‘ক্লেইম সোর্স ট্যাক্স’ অপশনে গিয়ে ‘সঞ্চয়পত্র’ নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।
নিয়মিত মুনাফার জন্য তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একটি পরিচিত বিনিয়োগমাধ্যম। এতে এক লাখ, দুই লাখ, পাঁচ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের সনদ কেনার সুযোগ রয়েছে। জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘরের মাধ্যমে এটি কেনা ও নগদায়ন করা যায়।
এই সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ তিন বছর। বিনিয়োগের পরিমাণ এবং নগদায়নের সময়ের ওপর মুনাফার হার নির্ভর করে। নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়ন করলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী মুনাফার হার কমে যেতে পারে এবং আগে বেশি মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে অতিরিক্ত অর্থ মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী ক্রেতার যোগ্যতা ও বিনিয়োগের সীমা আলাদা। সাধারণ সঞ্চয়পত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। বিনিয়োগের সীমা ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক বা যৌথ মালিকানা এবং প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
রিটার্নে তথ্য দেওয়ার সময় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে — মূল বিনিয়োগের পরিমাণ, অর্জিত মুনাফা এবং উৎসে কর্তিত কর। এই তিনটি তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য, সঞ্চয়পত্রের সনদ এবং কর কর্তনের বিবরণ যাচাই করে নেওয়া ভালো। প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন, বিনিয়োগের ধরন এবং করদাতার আয় ও করদায়ের ওপর।




