শেরপুরের গাড়ো পাহাড়ে ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব শুরু আজ, অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থীর সমাগমের প্রত্যাশা

ভারত সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের গাড়ো পাহাড়ের বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লীতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তীর্থোৎসব ঘিরে বইছে উৎসবের আমেজ। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে ক্যাথলিক খ্রিস্টভক্তদের ধর্মীয় নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তীর্থোৎসব শুরু হবে; শেষ হবে আগামীকাল ৩০ অক্টোবর দুপুরে।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী বারোমারী এলাকায় অবস্থিত এই ধর্মপল্লী। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাথলিক খ্রিস্টভক্তরা উৎসবে যোগ দিতে আসতে শুরু করেছেন।
আয়োজকদের ধারণা, দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থী এবারের উৎসবে যোগ দেবেন। এবার গতবারের চেয়ে বেশি খ্রিস্টভক্তের সমাগম হবে বলেও ধারণা করছেন আয়োজকরা।
এবারের তীর্থে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পল পলেন কুবি সিএসসি। তিনি ধর্মীয় নির্দেশনা দেবেন।
‘মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া’—এই মূল সুরে বিকেল ৩টায় পাপস্বীকারের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুই দিনব্যাপী উৎসব। বিকেল ৪টায় হবে পবিত্র খ্রিস্টযাগ।
রাত ৮টায় বিশাল আলোর মিছিলে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাবেন দেশের সর্ববৃহৎ ৪৮ ফুট উঁচু মা মারিয়ার মূর্তির পাদদেশে। রাত ১২টায় হবে নিশিজাগরণ ও নিরাময় অনুষ্ঠান।
পরদিন শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ এবং সকাল ১০টায় মহা খ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের তীর্থোৎসব।
বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের ফাদার তরুণ বনোয়ারী বলেন, তীর্থে আগত খ্রিস্টভক্তরা তাদের নানা মানত পূরণ করতে ঈশ্বরজননী মা মারিয়ার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জানাবেন এবং তাঁর অকৃপণ সাহায্য প্রার্থনা করবেন। রাতের আলোক শোভাযাত্রায় পাপমোচনে জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে খালি পায়ে ধর্মীয় বাণী উচ্চারণ করে তীর্থস্থানের উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার আড়াই কিলোমিটার পথ পরিভ্রমণ করবেন তারা।
তিনি বলেন, এবারের আয়োজনে কোনো কমতি নেই, দেশ-বিদেশের অনেক পুণ্যার্থী আসছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিভিল প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে, এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন।
শেরপুরের পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, তীর্থকে উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। চার শতাধিক পোশাকি পুলিশসহ সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, তৈরি করা হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির জেলা শেরপুর; এ জেলায় নানা ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে তারা কাজ করছেন। বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের ফাদার তরুণ বনোয়ারীর নেতৃত্বে একটি টিমের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তীর্থোৎসব ঘিরে রাস্তা সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জাসহ সব প্রস্তুতি গতকাল বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর পাহাড়ের বুকে পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে তৈরি করা হয় এই ধর্মপল্লী। ১৯৯৮ সাল থেকে এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান ধর্মীয় সমাবেশ।
প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় ফাতেমা রানীর এই তীর্থোৎসব, যার মূল আকর্ষণ আলোক শোভাযাত্রা। শুধু শেরপুর নয়, দেশ-বিদেশের প্রায় লাখো পুণ্যার্থী এ তীর্থযাত্রায় অংশ নেন বলে আয়োজকরা জানান।




