সাতক্ষীরার আটুলিয়ায় লবণাক্ততা আর পানিকষ্টে টিকে থাকার লড়াই, আন্তালিয়ায় কপ৩১-এর আগে সুরক্ষার প্রশ্ন

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রমজান শেখের (৫৫) বসতঘর বেড়িবাঁধের খুব কাছেই। বছরে কয়েকবার তাঁকে ঘর মেরামত করতে হয়। সুপেয় পানির অভাব, আয়-উপার্জনের সংকট আর কৃষিজমিতে লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে টিকে থাকার লড়াই তাঁর প্রতিদিনের।
তাঁর প্রতিবেশী হাসমত আলী (৪৫) সুন্দরবনে কাজ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মুখমণ্ডলের একাংশ হারিয়েছেন। তিনিও বহুমুখী সংকটের কথা জানিয়েছেন। বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিলে এই মানুষগুলোর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়।
রমজান শেখ বলেন, ‘আমাদের লড়াই শেষ হয় না। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবনের লড়াই কঠিন করে। টিকে থাকার জন্য আমাদের জীবন-জীবিকার ধরন বারবার পরিবর্তন করতে হয়। এ এক অস্থিতিশীল জীবন। একটাই দাবি, আমরা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই।’
আটুলিয়া দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একটি দুর্যোগপ্রবণ ইউনিয়ন। রাজধানী ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ২৮৮ কিলোমিটার এবং সাতক্ষীরা জেলা সদর থেকে প্রায় ৫৭ কিলোমিটার। এই ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বহুমুখী সংকটের মধ্যে বসবাস করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খোলপেটুয়া নদীর পাশের সরু বেড়িবাঁধে জোয়ারের সময় ঢেউয়ের ধাক্কা লাগে। নদীতে পানি বাড়লে কিংবা বাতাসের তীব্রতায় ঢেউ বাড়লে আটুলিয়ার মানুষের ভয় বাড়ে। এক পাশে নদী, অন্য পাশে বসতি—মাঝখানে সরু চলার পথ।
এলাকার অন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের মধ্যে রয়েছে পদ্মপুকুর, প্রতাপনগর, বুড়িগোয়ালিনী, রমজাননগর, কৈখালী, গাবুরা, উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানির উৎস পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্ফানের পর বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকেছে। ফলে আমন ও বোরো মৌসুমে প্রথাগত ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বছরের বড় একটি সময় জমি পতিত থাকে। জলোচ্ছ্বাসে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রাম ও মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতাও তৈরি হয়।
কৃষক মোবারক হোসেন জানিয়েছেন, অনাবৃষ্টিতে জমিতে লবণ বেড়ে ধানগাছ লাল হয়ে যায়। আগে সপ্তাহে একবার সেচ দিলেই হতো, এখন সপ্তাহে দুবার সেচ দিতে হচ্ছে। আগে এক বিঘা জমিতে এক লিটার ডিজেল লাগত, এখন দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় বিঘাপ্রতি আড়াই লিটার ডিজেল লাগছে।
রমজান শেখের ভাষ্য, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের শীষ ছোট হয়ে যাচ্ছে, শীষ বের হওয়ার পর শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। জমিতে রাসায়নিক সারও বেশি দিতে হচ্ছে, জ্বালানি খরচ বাড়ছে এবং অনাবৃষ্টির কারণে বিঘাপ্রতি ছয়-সাত মণ ধান কম হচ্ছে।
বারসিকের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় চাষের সময় সংকুচিত হচ্ছে, বীজের অঙ্কুরোদগম কমছে, ফুল ও ফল কম হচ্ছে এবং ফলের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা ওঠানামায় হাঁস-মুরগির ডিম উৎপাদনও কমে যাওয়ার কথা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পানিকষ্টের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট তালবাড়িয়া ও আটুলিয়া গ্রামে। এই দুই গ্রামে প্রায় ৩০০ পরিবারের বাস, লোকসংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। সুপেয় পানির উৎস সেখান থেকে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার দূরে—একই ইউনিয়নের হেঞ্চি গ্রামে মনোরঞ্জন বৈরাগীর বাড়ির পুকুরপাড়ে বসানো ফিল্টার। ভোর থেকে শুরু হয় পানি সংগ্রহ, সকালের পর আবার বিকেলের পালা।
স্কুলশিক্ষক তাপস কুমার মণ্ডল বলেন, এই এলাকায় আগেও পানির সংকট ছিল, তবে আইলার পর থেকে পানিকষ্ট অস্বাভাবিক বেড়েছে। এই দুই গ্রামের কোনো মানুষই প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি পান না। সুজাতা মণ্ডল জানিয়েছেন, দিনে দুই কলসি পানি সংগ্রহ করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
গাবুরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীখালী গ্রামের জরিনা খাতুনের কথায়, অতিথির জন্য এক জগ পানি ব্যয় করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। ঘরের সব পাত্র সুপেয় পানি সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয় এবং শুকনো মৌসুমে পানি ব্যবহারে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের উপকূলীয় শহর আন্তালিয়ায় বসছে কপ৩১ সম্মেলন। আন্তালিয়া এক্সপো সেন্টারে অনুষ্ঠেয় এই আসরে বিশ্বনেতারা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় মিলিত হবেন। আটুলিয়ার মানুষের সংকট সেই সম্মেলনে কতটা পৌঁছাবে, সেই প্রশ্নই তুলে ধরেছে প্রতিবেদনটি।


