স্পেনে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার আগের অডিও প্রকাশ: থেমে থাকা ট্রেনের সামনে চলার অনুমতি

স্পেনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিংয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার আগের মিনিটগুলোতে চালকদের সঙ্গে রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কথোপকথন শোনা গেছে। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।
বুধবার সকালে মাদ্রিদ থেকে সেভিয়াগামী একটি ট্রেন একই লাইনে থেমে থাকা আরেকটি ট্রেনে আঘাত করলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কর্মকর্তারা দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করছেন।
মাদ্রিদের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও দুই চালকের মধ্যে তিনটি অডিও রেকর্ডিং থেকে মনে হচ্ছে, একটি দ্রুতগতির ট্রেনকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও প্রায় ২৫ কিলোমিটার (১৫ মাইল) সামনে আরেকটি ট্রেন থেমে ছিল।
রাষ্ট্রীয় অপারেটর রেনফের ট্রেনটিতে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন। একই লাইনে তার সামনে ছিল বেসরকারি অপারেটর ইরিওর ট্রেন, যাতে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন।
স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় কম্পিউটার ত্রুটির খবর পাওয়ার পর আক্রান্ত অংশে সব ট্রেন থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে রেনফে ট্রেনটিকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়, যা স্পেনের পরিবহনমন্ত্রীর ভাষায় ছিল ‘ভুল’।
এল পাইস ও আরটিভিইসহ স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রেকর্ডিংয়ে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের অপারেটর রেনফে ট্রেনের চালককে বলেন, ‘আপনার যাত্রা চালিয়ে যান এবং তারপর ল্যাটারাল সিগন্যালিং ব্লকের অধীনে স্বাভাবিক গতিতে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যান।’ চালক জিজ্ঞেস করেন, ‘স্বাভাবিক গতিতে?’ অপারেটর উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ।’ ল্যাটারাল সিগন্যালিং ব্লক হলো স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং বা তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে ব্যবহৃত বিকল্প ব্যবস্থা।
আরেকটি রেকর্ডিংয়ে ইরিও ট্রেনের চালক বলেন, ট্রেন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং ট্রেনটি নড়ছে না। চালক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে বলেন, ট্রেনটি ‘উর্দার প্রবেশ সিগন্যালের সামনে স্থির হয়ে আছে’। কয়েক দফা কথোপকথনের পর তাকেও স্বাভাবিকভাবে যাত্রা পুনরায় শুরু করতে বলা হয়।
পরের আরেকটি রেকর্ডিংয়ে ইরিও চালক আবার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন, তারা ট্রেনটি চালু করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘ট্রেনটি আমাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে দিচ্ছে না। এ কারণেই আমি এখনো প্রবেশ সিগন্যালের সামনে থেমে আছি।’ এই রেকর্ডিং থেকে মনে হচ্ছে, রেনফে ট্রেনটি এগিয়ে আসার সময় ইরিও ট্রেনটি যে থেমে আছে, তা নিয়ন্ত্রককে জানানো হয়েছিল।
ইরিও বলেছে, তাদের ট্রেনটিকে অন্য ট্রেনটি ‘পেছন থেকে আঘাত করেছে’। স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বুধবার বলেন, কোনো গতি সীমাবদ্ধতা ছাড়া ট্রেনগুলোকে আবার চলতে নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ‘অব্যাখ্যেয়’।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেন, কর্তৃপক্ষ ‘দিনরাত’ কাজ করছে শুধু নিহতদের পরিবারকে সহায়তা করতে নয়, এই ট্র্যাজেডির প্রতিটি খুঁটিনাটি উদ্ঘাটন করতে এবং যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও। স্পেনে তিন দিনের জাতীয় শোক শুরু হয়েছে; এটিকে আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রেল বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
অডিও ফাঁসের সমালোচনা করেছেন কয়েকজন স্প্যানিশ রাজনীতিক। বামপন্থী সুমার জোটের কংগ্রেস সদস্য আলবার্তো ইবানিয়েজ এক্সে লিখেছেন, এই ফাঁস ‘জঘন্য’। পোদেমোস দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ইরেনে মন্তেরো বলেন, দুর্ঘটনার দায় একজন কর্মীর ওপর চাপানো উচিত নয়; চালক ও বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে রেল খাতের উদারীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করে আসছেন।
বুধবার রাতে মাদ্রিদে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভবনের বাইরে প্রায় ১,৫০০ মানুষ জড়ো হন বলে স্প্যানিশ সম্প্রচারমাধ্যম টিভিই জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা মূলত সানচেজ ও পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করছিলেন। বোতল ও আতশবাজি ছোড়ার পর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে; কোনো আহত বা গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার রেল চালকেরা পূর্বনির্ধারিত ধর্মঘট পালন করেন। স্প্যানিশ ইউনিয়ন অব রেলওয়ে ড্রাইভার্স (সেমাফ) বলেছে, এই ধর্মঘট ‘রেল নিরাপত্তা রক্ষার’ জন্য করা হচ্ছে। প্রধান বিরোধী পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো বলেন, ‘স্পেনের জানার অধিকার আছে তার অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কী ঘটছে।’
দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা সারা রাত শক্তিশালী ফ্লাডলাইটের আলোয় ধাতব বগি কেটে হতাহতদের খুঁজেছেন; নিহতদের অনেককে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শত শত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। সিভিল গার্ডের মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ থেকে ৯০০ জনের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং এখন অগ্রাধিকার মরদেহ শনাক্ত করা। নিখোঁজদের খোঁজে মাদ্রিদ, তোলেদো, সেভিয়া ও কর্দোবায় সিভিল গার্ডের দপ্তর খোলা হয়েছে।
বুধবারের এই দুর্ঘটনা ২০১৩ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা। ২০১৩ সালে দেশটির উত্তর-পশ্চিমে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার উপকণ্ঠে দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত হয়েছিলেন।


