জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশের বছরে ক্ষতি ২ হাজার ৭০ কোটি ডলার, জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ: কেএইচআই প্রতিবেদন

বাংলাদেশে তাপ ও জলবায়ুসংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বছরে ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারের (২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন) অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এ অঙ্ক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যু এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য ও পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: পাথওয়েজ, কস্টস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এবং গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০-এর দশকের তুলনায় ২০২০-এর দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা বাড়ায় শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এতে হৃদ্রোগ, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এ কর্মঘণ্টার অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষি খাতের।
তীব্র গরমে নির্মাণশ্রমিকসহ উন্মুক্ত স্থানে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর পেশার মানুষেরাও কর্মক্ষমতা ও আয় হারাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে দেশে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই বছরে বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণের সঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলেও মডেলভিত্তিক হিসাবে উঠে এসেছে।
বায়ুদূষণ এবং প্রাণঘাতী নয় এমন অসুস্থতার ব্যয় ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বোঝা আরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের চার সপ্তাহে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে শুধু ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার; এ হিসাবে বহির্বিভাগের চিকিৎসা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে ৪১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে বন্যায় পানীয় জল দূষিত হওয়া, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশের মোট চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিবারগুলো নিজেদের পকেট থেকে বহন করেছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জলবায়ুসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে। এ ক্ষতি কমাতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্নভাবে জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি মোকাবিলায় আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায়ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।’
কেএইচআই আগামী গরম মৌসুমের আগেই জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ১৬ জেলায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়নের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি হাসপাতালের জরুরি প্রস্তুতি, কর্মক্ষেত্রে বিশ্রাম ও পানীয় জলের ব্যবস্থা, ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং জলবায়ুসংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।




