শহীদ মিনারে উদীচীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: আগুন-বোমা-মবেও থামবে না সাংস্কৃতিক আন্দোলন, বক্তাদের প্রত্যয়
বর্ণাঢ্য আয়োজনে হয়ে গেল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শুরু হয় এই আয়োজন।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্লোগান ছিল ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেব’।
জাতীয় সংগীত ও সংগঠনের সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা এবং উদীচীর পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শুরু হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বাউলশিল্পী শেখ জামাল উদ্দিন (টুনটুন ফকির) এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবীবুল আলম।
আলোচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেন হাবীবুল আলম। বক্তব্য দেন বাউলশিল্পী শেখ জামাল উদ্দিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফি রতন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, লেখক ও গবেষক জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক সুতপা বেদজ্ঞ, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এবং ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক রুমি দে। সঞ্চালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; সমাজের অন্যায়, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এই দায়িত্ববোধ থেকেই উদীচী দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
তারা আরও বলেন, লড়াই-সংগ্রামের লক্ষ্য নিয়েই উদীচীর জন্ম। সেই অঙ্গীকারকে ধারণ করে সংগঠনটি এগিয়ে চলেছে। তবে এই পথ কখনো মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে হামলা ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে সংগঠনটিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
আগুন সন্ত্রাস, মব সন্ত্রাস, বোমা কিংবা কোনো ধরনের বাধা দিয়েই উদীচীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন থামানো যাবে না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সংগঠনটির নেতারা।
লেখক ও গবেষক সুতপা বেদজ্ঞ বলেন, নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে এবং তাদের ভাষা ও চিন্তাভাবনা বুঝতে হবে। একই সঙ্গে সংগঠনের ভেতরে গণতান্ত্রিক আত্মসমালোচনার পরিসর তৈরি করতে হবে।
লেখক ও গবেষক জাকির হোসেন বলেন, উদীচী বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে। কিন্তু বর্তমানে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বৈষম্য আরও বেড়েছে। আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, মৌলবাদের নতুন উত্থানের ফলে উদীচীর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। গান, কবিতা ও নাটকসহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক শক্তি মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফি রতন সমাজবিপ্লব ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উদীচীর ওপর অতীতের হামলার প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে হামলা চালিয়ে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের হত্যা করা হয়েছিল। নেত্রকোনায়ও প্রাণ হারিয়েছিলেন আটজন শিল্পী ও কর্মী। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এসব সত্ত্বেও সংগঠনটির আন্দোলন থেমে যায়নি।
অনুষ্ঠানে উদীচীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সংগীতদলের সদস্য তাজিম সুলতানাকে সম্মাননা জানানো হয়। আয়োজনে ছিল আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা; আবৃত্তি পরিবেশন করেন অনন্যা লাবণী পুতুল ও মাহমুদুল হাসান।




