পাকিস্তানে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি ও তাঁর স্বামীর ১০ বছরের কারাদণ্ড
পাকিস্তানের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি ও তাঁর স্বামী হাদি আলী চাথাকে সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের ভেতরে চলা বিচারের পর বিচারক তাহির আব্বাস সিপরা এই রায় ঘোষণা করেন। এএফপির হাতে পাওয়া রায়ের অনুলিপি অনুযায়ী বিচারক লিখেছেন, এই দম্পতি ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট দলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন এবং এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসের অনুভূতি তৈরির উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়।
একই রায়ে স্বীকার করা হয়েছে, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ ধরনের — একটি ব্যারিয়ার সরিয়ে ফেলার মতো ঘটনা। মামলাটি ২০২৪ সালের অক্টোবরের একটি ঘটনা নিয়ে, যখন এই দম্পতি রাজধানী ইসলামাবাদে সফররত ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের জন্য নির্ধারিত একটি পথে সড়কের ব্যারিয়ার সরিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
গত ৭ অক্টোবর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পুলিশকে বাধা দেওয়া ও জনস্বার্থে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন।
রয়টার্সের হাতে পাওয়া বিবৃতিতে এই দম্পতি অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের ‘বিবেকের বন্দি’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, মানবাধিকারকর্মের কারণেই তাঁদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তাঁদের প্রতিরক্ষা নথিতে আগে বলা হয়েছিল, যারা অত্যাচার, নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তাঁদের মধ্যে শীতল প্রভাব আরও পোক্ত করতে তাঁদের উদাহরণ বানানো হচ্ছে।
ইমান মাজারির মা ও কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের আমলের সাবেক মানবাধিকারমন্ত্রী শিরিন মাজারি এই বিচারকে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া ‘সাজানো বিচার’ বলেছেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, দম্পতিকে নিজেদের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথিও দেওয়া হয়নি। প্রতিরক্ষা পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করবে বলেও তিনি জানান।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই দণ্ডকে পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির ইয়াসমিন আহমেদ বলেন, এটি ছিল ন্যায়বিচার ও সুষ্ঠু বিচারের অধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগের সক্ষমতার পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষায় এটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ইমান ও হাদিকে তাঁদের মানবাধিকার প্রচারের শাস্তি দিতেই এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক উপ-আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পন্ত বলেন, ইমান ও হাদির পুনরায় গ্রেপ্তারই প্রমাণ করে, তাঁদের বিরুদ্ধের অভিযোগগুলো মানবাধিকারকর্মের শাস্তি দেওয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁর মতে, এই মামলা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, কর্তৃপক্ষ সমালোচনামুখর কণ্ঠের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে কতটা প্রস্তুত।
ইমান মাজারি ও হাদি আলী চাথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে আলাদা একটি মামলায় গত ২৩ জানুয়ারি থেকে হেফাজতে রয়েছেন। পরদিন একটি নিম্ন আদালত পাকিস্তানের প্রিভেনশন অব ইলেকট্রনিক ক্রাইমস আইনে তাঁদের প্রত্যেককে ১৭ বছরের সাজা দিয়েছিলেন। সমালোচকদের মতে, অনলাইনে সরকারবিরোধী ভিন্নমত দমনে এই আইন তৈরি। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই সাজা স্থগিত করলেও একই দিনে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মামলায় পুলিশ এই দম্পতিকে আবার গ্রেপ্তার করে।
পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার বারবার বলেছেন, দেশটির বিচার বিভাগ স্বাধীন।


