৫০০ পেঙ্গুইনের মৃত্যুর রহস্য মিলল: বার্ড ফ্লু নয়, অপরাধী পাখির কলেরা

অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কাছের ডেঞ্জার দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ শতাধিক অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল বার্ড ফ্লু এই মৃত্যুর কারণ, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে পাখিগুলো মারা গেছে এভিয়ান কলেরা নামের একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে, যা মানুষের কলেরা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
২০২৪ সালের মার্চে ড. রালফ ভ্যানস্ট্রিলস জাহাজে করে ডেঞ্জার দ্বীপপুঞ্জের দিকে রওনা হয়েছিলেন। আর্জেন্টিনায় অবস্থানরত এই বন্যপ্রাণী চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের সঙ্গে যুক্ত। ওই সময় এলাকাজুড়ে একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছিল এবং মৃত পাখি পড়ে থাকার খবর আসছিল, তাই তিনি জানতেন কী দেখতে পেতে পারেন।
দ্বীপের একটি অবতরণ র্যাম্পে পৌঁছেই দলটি তুষারের মধ্যে সারি সারি উঁচু ঢিবি দেখতে পায়। প্রতিটি ঢিবি পাথর নাকি মৃতদেহ, তা বুঝতে তুষার খুঁড়ে নিবিড়ভাবে খুঁজতে হয়েছে বলে জানান ভ্যানস্ট্রিলস। শুধু ওই র্যাম্পেই তারা ৫৩৭টির বেশি পেঙ্গুইনের মৃতদেহ পান; র্যাম্পটির আকার ছিল প্রায় একটি বিমানবন্দরের রানওয়ের সমান।
ডেঞ্জার দ্বীপপুঞ্জে অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের দুটি বিশাল কলোনি রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, দ্বীপগুলোতে হাজার হাজার অ্যাডেলি পেঙ্গুইন ও অন্যান্য প্রজাতির পাখি মারা গেছে। তবে পুরোপুরি গণনা করা সম্ভব হয়নি, কারণ হিমশৈল পথ আটকে দিলে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকায় সেখানে বেশিক্ষণ থাকা যায় না।
বার্ড ফ্লু ২০২৩ সালের শেষ দিকে ও ২০২৪ সালের শুরুতে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছেছিল। সেই আশঙ্কা থেকেই অভিযানটি সাজানো হয়েছিল বার্ড ফ্লু খোঁজার জন্য। সুরক্ষা পোশাক, দ্বিগুণ গ্লাভস, গগলস ও মাস্ক পরে দলটি মৃত পেঙ্গুইনগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে এবং সেগুলো জাহাজের ছোট গবেষণাগারে পরীক্ষা করে।
সন্ধ্যার মধ্যেই প্রাথমিক ফল আসে, তবে তা প্রত্যাশিত ছিল না। ভ্যানস্ট্রিলস বলেন, সেখানে বার্ড ফ্লু ছিল, কিন্তু ভাইরাসের পরিমাণ ছিল খুব কম। মৃতদেহগুলো খুব পুরোনো ছিল না; বার্ড ফ্লুই যদি মৃত্যুর কারণ হতো, তাহলে ভাইরাসের পরিমাণ অনেক বেশি পাওয়ার কথা ছিল। ফলে দলটি অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়—আসল কারণ তাহলে অন্য কিছু।
কয়েক মাস পর নেদারল্যান্ডসে ভ্যানস্ট্রিলসের সহকর্মীরা আরও পরীক্ষা করেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়, পেঙ্গুইনগুলোর টিস্যুতে ভাইরাস নয়, রয়েছে ব্যাকটেরিয়া। সেখান থেকেই শনাক্ত হয় এভিয়ান কলেরা। দলটির এই গবেষণা অক্টোবরে ‘প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
ভ্যানস্ট্রিলস জানান, পাখিদের জন্য বিশেষায়িত এই ব্যাকটেরিয়ার ধরন মানুষের জন্য বিশেষায়িত ধরন থেকে আলাদা, তাই মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি তেমন বেশি নয়। তবে রোগটি সারা বিশ্বে পাখি মারে, বিশেষ করে ঠান্ডা পরিবেশে, যেখানে ব্যাকটেরিয়াটি ভালোভাবে বেঁচে থাকে। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে এই রোগটি সর্বশেষ খোঁজা হয়েছিল ২৫ বছর আগে; গবেষকদের ধারণা, এর মধ্যে হয়তো নিয়মিতই এ রোগে পাখি মরেছে, কিন্তু কেউ পরীক্ষা করে দেখেনি।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে প্রায় ৩০ কোটি হাঁস-মুরগির মৃত্যুর কারণ হয়েছে—ভাইরাসে মারা গেছে অথবা সংক্রমণ ঠেকাতে জবাই করা হয়েছে বলে ওয়ার্ল্ড অ্যানিম্যাল হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য বলছে। এ ছাড়া লাখ লাখ বন্যপ্রাণী ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীও এই ভাইরাসে মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়।
ভ্যানস্ট্রিলসের মতে, এই ঘটনার বড় শিক্ষা হলো—বার্ড ফ্লু নিয়ে উদ্বেগ যতই বড় হোক, অন্য রোগগুলোও পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কারণ সেগুলো এর মধ্যেই মিশে থাকতে পারে।



