দুই দিনের নীরবতায় প্রাণ ফিরল খেরসনে, যুদ্ধবিরতি শেষের আগেই ফের হামলার শঙ্কা

ইউক্রেনের খেরসন শহর প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম দুই দিনের শান্তি দেখল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়ার অবিরাম আকাশ হামলা থেমে যাওয়ায় ফ্রন্টলাইন অঞ্চলের এই শহরের বাসিন্দারা বিরল স্বস্তির মুহূর্ত কাটিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ড্রোন-প্রতিরোধী জালে ঢাকা রাস্তায় মানুষ হাঁটছেন এবং শহরের চত্বরগুলোতে জড়ো হচ্ছেন—এমন সাধারণ দৃশ্য, যেখানে সাধারণত এক চোখ আকাশে ও এক কান ড্রোনের শব্দের দিকে রাখতে হয়।
খেরসন থেকে ফোনে ৪২ বছর বয়সী ওলগা বলেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এসেছে এবং সবাই উচ্ছ্বসিত। ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎসের ভাষায়, মঙ্গলবার থেকে খেরসন আক্ষরিক অর্থেই আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে; মানুষ শান্তভাবে বাইরে বের হচ্ছেন, হাঁটছেন, শরতের রোদ উপভোগ করছেন।
এই সাময়িক বিরতি রোববার শেষ হওয়ার কথা। যুদ্ধবিরতিটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে—দিনিপ্রো নদীর ওপারে রাশিয়া-অধিকৃত ওলেশকি শহর থেকে বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতে। কয়েক দিন ধরে রুশ বাহিনী সড়ক থেকে মাইন সরাচ্ছে এবং শুক্রবার ওলেশকির বেসামরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে; রোববারের মধ্যে এই সরিয়ে নেওয়া শেষ হওয়ার কথা, তারপরই যুদ্ধবিরতি শেষ হবে।
তবে আশঙ্কা রয়েছে, মানবিক অভিযানের পাশাপাশি রাশিয়া এই বিরতিকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করছে। স্থানীয় সরকারে কর্মরত এক অজ্ঞাতনামা সূত্রের ভাষায়, রুশ বাহিনী এই সুযোগে অবস্থান মজবুত করছে, সামরিক সরবরাহ, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও ড্রোন আনছে এবং সেনা পুনর্বিন্যাস করছে।
ইউক্রেনের ‘সেন্টার ফর স্টাডিং দ্য অকুপেশন’-এর পরিচালক পেত্রো আন্দ্রিউশচেঙ্কো বলেন, খেরসনের বাসিন্দারা তাঁকে জানিয়েছেন, ওলেশকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের রাদেনস্কের আশপাশে সামরিক সমাবেশ দেখা গেছে। তাঁর মতে, ওলেশকির বাসিন্দারা রক্ষা পাবেন, কিন্তু একই সঙ্গে শত্রুকে যুদ্ধবিরতির সুযোগ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে; বিরতি শেষ হলে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হতে পারে।
মঙ্গলবার থেকে কোনো পক্ষের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি। খেরসনের বাসিন্দা দিমা বলেন, আগেও যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সাধারণত মানা হয়নি; এবারই প্রথম গোলাগুলি থেমেছে, মানুষ ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। মানুষ দোকানে যাচ্ছেন, কফি খাচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন—শহরটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
এই সপ্তাহে বহু মানুষ শহরের তথাকথিত ‘রেড জোনে’ থাকা নিজেদের বাড়ি ও সম্পত্তির কাছে যেতে পেরেছেন—যে এলাকাটি ড্রোন ও কামানের হামলার এতটাই মুখে যে তা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। খেরসনে বসবাসরত চেক স্বেচ্ছাসেবী ডেনিসা বোহাচকোভা বলেন, কেউ কেউ এমন জায়গায় যাচ্ছেন, যেখানে বছরের পর বছর কেউ যাওয়ার সাহস করেনি। ফিরে গিয়ে কেউ দেখেছেন বাড়ি পুড়ে ফাঁকা খোলস হয়ে আছে, কারও বাড়ি লুট হয়েছে।
কারও ফেরার কারণ ছিল সম্পত্তির চেয়েও বড়। আঞ্জেলা দোব্রোভোলস্কার স্বামী সেরহি দুই বছর আগে রুশ ড্রোন থেকে ফেলা গ্রেনেডে নিহত হন। বৃহস্পতিবার আঞ্জেলা কিয়েভ থেকে খেরসনে এসেছেন কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবার স্বামীর কবর দেখতে। তিনি বলেন, সবাই খেরসনের দিকে ছুটছে, তিনিও কবরস্থানে যাবেন।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে খেরসনের জনসংখ্যা আড়াই লাখের বেশি থেকে কমে প্রায় ৬৫ হাজারে নেমেছে; আগামী ফেব্রুয়ারিতে এই যুদ্ধ ছয় বছরে পড়বে। শহরে বেসামরিক জীবন কখনো থামেনি, তবে তা চলেছে সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে—স্কুল, থিয়েটার, কিন্ডারগার্টেন ও হাসপাতাল মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুই সন্তানের মা ওলগা জানান, নিয়মিত ব্ল্যাকআউট, ড্রোন থেকে ফেলা ও পড়ে থাকা পাতায় লুকিয়ে থাকা মাইন এবং বিকেলের মধ্যেই থমকে যাওয়া শহরই ছিল তাঁদের স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু নীরবতা নামার পর থেকে তিনি অন্য শহরে গাড়ি চালিয়ে গেছেন, বাসে করে ছেলেকে নিয়ে দাদির কাছে গেছেন; চারদিকে দোকান ও ক্যাফে ছিল ভরা, এমনকি ছোটখাটো যানজটও দেখা গেছে।
ওলেশকি থেকে সরিয়ে নেওয়া রোববারের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা এবং তার পরই যুদ্ধবিরতি শেষ হবে। ওলগার শঙ্কা, সোমবার থেকে পরিস্থিতি সত্যিই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে। দিমা বলেন, সবাই জানে হামলা আবার শুরু হবে এবং তা আরও বাড়বে। তবু তাঁর ভাষায়, এই কয়েক দিন দেখিয়ে দিয়েছে, সবকিছু সত্যিই শেষ হলে জীবন কেমন হতে পারত।


