প্লাস্টিকে ঢেকে যাচ্ছে সুন্দরবনের শ্বাসমূল, কমছে কাঁকড়া-শামুক; মাছের দেহেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে প্লাস্টিক বর্জ্যে ঢেকে যাচ্ছে গাছের শ্বাসমূল। পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও পলিথিনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নতুন চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি। যেসব এলাকায় প্লাস্টিক বেশি জমছে, সেসব এলাকায় কাঁকড়া, শামুকসহ জলজ প্রাণীর বিচরণও কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক—পানি, মাটি ও জলজ প্রাণীর দেহে শনাক্ত হচ্ছে প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র কণা। বনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। তবে এরপরও নেই কার্যকর ব্যবস্থা।
সম্প্রতি সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী, জামতলা, ডিমের চর, আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাছের গোড়া, শ্বাসমূলের চারপাশ ও বনের মাটিতে জমে আছে পলিথিন, নাইলন জাল, প্লাস্টিকের বোতল, দড়ি, কর্কশিটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। ডিমের চরে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা উদ্ভিদের বীজের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক জমে থাকতে দেখা গেছে।
বাগেরহাটের শরণখোলা ও বরগুনার পাথরঘাটার বনজীবীরাও একই চিত্রের কথা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, কটকা, কচিখালী ও ডিমের চর এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য বেশি জমে থাকা স্থানগুলোতে আগের তুলনায় কাঁকড়া, শামুক ও অন্যান্য তলদেশবাসী প্রাণীর বিচরণ কম দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যক্ত জাল ও প্লাস্টিকের দড়ি নতুন চারার সঙ্গে জড়িয়ে স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। কোথাও পলিথিন জমে রয়েছে গাছের শ্বাসমূলে। এসব এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে নতুন চারা জন্মানোর হার ও গাছপালার ঘনত্ব কমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য প্লাস্টিক বর্জ্যের ভূমিকা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ও গবেষক শেখ তারেক আরাফাত বলেন, বড় প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কাঁকড়া, শামুকসহ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এতে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দূষিত এলাকায় প্রাণীর বিচরণ কমে যাওয়ার পেছনেও প্লাস্টিকের ভূমিকা থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বাংলাদেশের গবেষণাতেও। ২০২২ সালে ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় সুন্দরবনের জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরের প্রাণীর দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন গবেষকেরা। এতে প্রাথমিক ভোক্তা প্রাণীতে গড়ে প্রতি প্রাণীতে ০.৫৬টি এবং খাদ্যজালের চতুর্থ স্তরের ভোক্তা প্রাণীতে গড়ে ৪.১৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের নমুনায় প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২ দশমিক ২২টি এবং প্রতি কেজি মাটিতে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় সুন্দরবন ও বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলের নদী-খাল থেকে সংগৃহীত আট প্রজাতির ৬৪টি মাছের প্রতিটির পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। প্রতি মাছে গড়ে পাওয়া যায় ৭ দশমিক ১টি কণা। তলদেশে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে গড় কণার সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ৭৮টি, আর ওপরের পানিতে বিচরণকারী মাছের ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৯২টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. গওসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বলেন, প্লাস্টিকদূষণের প্রভাব সরাসরি বনের বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে। সুন্দরবনের জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরের প্রাণীর দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব ক্ষুদ্র কণা বিভিন্ন প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি নির্ধারণে আরও সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন তো একটাই। এটি নষ্ট হলে বিকল্প কোনো অপশন নেই আমাদের।’
সচেতনমহল বলছে, সুন্দরবনের পানি, পলি ও জলজ প্রাণীর দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হলেও দৃশ্যমান প্লাস্টিক বর্জ্যে গাছপালা, প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ও তলদেশবাসী প্রাণীর সরাসরি ক্ষতির মাত্রা নিয়ে গবেষণা জরুরি। প্লাস্টিকে ঢাকা শ্বাসমূল, নতুন চারার বৃদ্ধি, বীজের অঙ্কুরোদ্গম, গাছের সজীবতা এবং কাঁকড়া-শামুকের আবাসস্থলের পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তুলনামূলক গবেষণাও প্রয়োজন। প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি এসব ক্ষতির প্রকৃতি ও মাত্রা নির্ণয় করা জরুরি বলেও মনে করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা শিক্ষকেরা।
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন বিভাগে বর্তমানে জনবলসংকট রয়েছে, বনরক্ষীদের ১৪০টি পদ শূন্য রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বন বিভাগ নিয়মিত প্লাস্টিক বর্জ্য বন থেকে সংগ্রহ করে বাগেরহাট ও খুলনায় ডাম্পিং করে। তবে তা সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় থাকা বর্জ্যের তুলনায় অনেকটা কম। পর্যটকদের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বনের ভেতর না নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, বনপ্রহরীরা নিয়মিত তল্লাশিও করছেন। তবে সাগর ও নদী থেকে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্যই সুন্দরবনের জন্য বড় সংকট বলে তিনি জানান।




