জানুয়ারির আগেই ঢাকায় বাসা ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ, দুশ্চিন্তায় ভাড়াটিয়ারা

জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার মধ্যেই রাজধানীর অনেক পরিবারের কাছে পৌঁছেছে জানুয়ারি থেকে বাসা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের বাড়িওয়ালা নোটিশে জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে তার ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৩ হাজার টাকা বাড়ানো হলো।
রফিকুল ইসলাম বেসরকারি একটি বিপণন কোম্পানিতে সাত বছর ধরে চাকরি করেন। তার বেতন দুই বছর ধরে ৪০ হাজার টাকাতেই আটকে আছে। অথচ গত এক বছরে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা এবং ছেলের স্কুলের বেতন বেড়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা—এর মধ্যেই এল বাড়তি ভাড়ার নোটিশ।
এই চিত্র শুধু মোহাম্মদপুরের নয়। মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা থেকে ধানমন্ডি—রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়িওয়ালারা নোটিশ দিচ্ছেন। কারও ভাড়া বাড়ছে ২ হাজার টাকা, কারও ৫ হাজার টাকা; গড়ে বাড়ছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
মালিবাগে ২২ হাজার টাকায় থাকা স্কুলশিক্ষিকা নাহিদা আক্তার বলেন, তার সংসারে আয় করেন দুজনই এবং দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী। তার স্বামীর অফিসে গত ঈদে বোনাস অর্ধেক দেওয়া হয়েছে, কোম্পানির অবস্থা ভালো নয় বলে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ভাড়া ৫ হাজার টাকা বাড়লে তার মেয়ের গানের ক্লাস বন্ধ করে দিতে হবে।
যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকেন ৬২ বছরের জামাল উদ্দিন। তার ১৪ হাজার টাকার বাসার ভাড়া বেড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। এই বয়সে নতুন বাসা খোঁজা, আবার অগ্রিম ও ট্রাক ভাড়ার টাকা তিনি কোথায় পাবেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বাড্ডায় সাবলেটে থাকা সুমি আক্তার বলেন, নিরাপত্তার জন্য নারী চাকরিজীবীরা একটু নিরাপদ বাসার জন্য ১ থেকে ২ হাজার টাকা বেশি দিতে রাজি থাকেন। বাড়িওয়ালারা সেই বিষয়টি জানেন বলেই তারা এও জানেন, নারীরা সহজে বাসা ছাড়বেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চার বছরে দেশে গড় বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভাড়া বেড়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ প্রান্তিকে বেড়েছে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে বছরের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন এলাকাভেদে ১৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব বলছে, পাঁচ বছর আগে একজন মধ্যবিত্তের আয়ের ৩৫ শতাংশ যেত বাসা ভাড়া আর খাবারের পেছনে; এখন সেটা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দেশে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন আছে ১৯৯১ সাল থেকে, তবে তা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে মানা হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাড়িওয়ালারা বলছেন, তাদের খরচও বেড়েছে। ধানমন্ডির একজন বাড়িওয়ালা, যিনি অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক এবং নাম প্রকাশ করেননি, বলেন, একটি ফ্ল্যাট রঙ করাতে আগে ১৫ হাজার টাকা লাগত, এখন মিস্ত্রি ২৮ হাজার টাকা চায়; পানির মোটরপাম্প, লিফটের সার্ভিসিং, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল—সবই বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাড়িওয়ালা আমিন মোহাম্মদ বলেন, সরকার পে-স্কেল বাড়ালে বাজারের সবাই ভাবে মানুষের হাতে টাকা এসেছে এবং দোকানদার জিনিসের দাম বাড়ায়। তার ভাষায়, ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে এবং বাসার চাহিদা প্রচুর; তিনি না বাড়ালে পাশের বাড়ি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, তিনি জোর করছেন না—যার পোষাবে সে থাকবে, না পোষালে চলে যাবে, এখন ভাড়াটিয়ার অভাব নেই।
ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার তুলনায় ভাড়া বাসার চাহিদা থাকায় বাসা ভাড়া বেশি; চাহিদা না থাকলে এটি সহনীয় পর্যায়ে থাকত। ভাড়া বৃদ্ধির পেছনে বাড়িওয়ালাদের যুক্তি যৌক্তিক কি না, তা দেখার কোনো ব্যবস্থা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাই বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা করা জরুরি বলে তিনি মত দেন; ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব বলেও তিনি বলেন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে তিনি খুশি। তবে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন না বাড়িয়ে সবকিছুর দাম বাড়ানো হলে তারা বাঁচবেন কীভাবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি; বাসা ভাড়াটা অন্তত এক বছর না বাড়ালে কি খুব ক্ষতি হতো, এমন প্রশ্নও করেন তিনি।




