কুড়ি-ত্রিশেই চুল পাকা ও পাতলা হওয়া শুধু জিনের কারণে নয়, জড়িত জীবনযাত্রাও

বয়স মাত্র ২০ বা ৩০-এর কোঠায়। অথচ আয়নায় তাকালেই নজরে পড়ছে দু-একটি রুপালি চুল। বন্ধুদের চুল যখন ঘন ও কালো, তখন নিজের মাথায় অসময়ে পাকা চুল বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়াটা দুশ্চিন্তার কারণ হওয়াই স্বাভাবিক। ঘরোয়া টোটকা থেকে নানা হেয়ার কেয়ার পণ্যের ছড়াছড়ির মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায়—অসময়ে চুল পাকা বা চুল পড়ার পেছনে জিন বা বংশগতির ভূমিকা ঠিক কতটা?
চুল পাকা বা সাদা হওয়া একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের ফোলিকলে থাকা মেলানিন—যা চুলকে কালো রং দেয়—তৈরি করার কোষগুলোর সক্রিয়তা কমতে থাকে। তবে ২০ বা ৩০ বছর বয়সে চুল পাকার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বংশগত বা জিনগত বৈশিষ্ট্য। অসময়ে চুল পাকার পেছনে সাধারণত ছয়টি বিশেষ জিনের ভূমিকা থাকে। এগুলো মূলত চুলের হরমোন নিয়ন্ত্রণ, কোষ পুনর্গঠন, ভিটামিন ডি সংকেত এবং আয়রন ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে।
এর মধ্যে এআর এবং এসআরডি৫এ২ জিন ডিএইচটি হরমোনের প্রতি চুলের ফোলিকলের সংবেদনশীলতা বাড়ায়। এর ফলে স্বাভাবিক হরমোন মাত্রাতেও চুলের ফোলিকল সংকুচিত হয়ে যায় এবং দ্রুত চুল পাকার পাশাপাশি চুল পড়া শুরু হয়। ইএসআর১ জিন ইস্ট্রোজেন হরমোনের সংকেত গ্রহণ করে চুলকে সুরক্ষা জোগায়; এই জিনের কার্যকারিতা কমে গেলে চুলের বৃদ্ধি থমকে যায়।
এমটিএইচএফআর জিন চুলের কোষ পুনর্গঠনে ফোলিক অ্যাসিড বা ফোলেটের ব্যবহার নিশ্চিত করে। এর ঘাটতি হলে চুলের কোষগুলোর পুনর্জন্ম ব্যাহত হয়। ভিডিআর জিন ভিটামিন ডি গ্রহণে সাহায্য করে চুলকে সতেজ রাখে। আর এইচএফই জিন শরীরে আয়রনের ভারসাম্য বজায় রাখে, যা চুলের স্বাস্থ্য ও অক্সিজেনের প্রবাহের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তবে পরিবারে কারও অকালে চুল পাকার ইতিহাস থাকলেই যে ঠিক একই বয়সে তা ঘটবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পারিবারিক ইতিহাস একটি বড় কারণ হলেও সব দোষ জিনের ওপর চাপিয়ে দিলে ভুল হবে। শরীর ও জীবনযাত্রার আরও নানা কারণ চুলের এই অসময় পরিবর্তনের জন্য দায়ী হতে পারে।
পুষ্টির ঘাটতি তার একটি। শরীরে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, আয়রন বা জিঙ্কের অভাব হলে চুল দ্রুত রং হারাতে পারে। শারীরিক সমস্যাও ভূমিকা রাখে—থাইরয়েডের সমস্যা, অটোইমিউন ডিজিজ যেমন অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা, বা হঠাৎ কোনো বড় অসুস্থতা চুল পড়ার অন্যতম কারণ। মানসিক চাপ চুলের ফোলিকলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায়, যা চুল দ্রুত পাকিয়ে দেয়। ধূমপান রক্তনালি সংকুচিত করে চুলের গোড়ায় পুষ্টি পৌঁছাতে বাধা দেয়।
বংশগত কারণে চুল পাতলা হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া’ বা প্যাটার্ন বল্ডনেস বলা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে—সামনের দিকে বা তালুতে—টাক তৈরি করে, আর নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত পুরো মাথার চুল পাতলা হয়ে যেতে দেখা যায়।
অনেকে জেনেটিক সমস্যা সমাধান করতে নানা ধরনের বায়োটিন বা কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করেন, যা অনেক সময়ই কাজ করে না। কারণ সমস্যা যদি জিনের সংবেদনশীলতায় থাকে, তবে সাধারণ ভিটামিন তা ঠিক করতে পারে না। হঠাৎ চুল পড়া বা পাকার হার বেড়ে গেলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে একজন বিশেষজ্ঞ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্যাটার্ন হেয়ার লসের জন্য মিনোক্সিডিল বা ডিএইচটি ব্লকার বেশ কার্যকরী। এ ছাড়া চরম ক্ষেত্রে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করা যেতে পারে, যদিও এটি বংশগত প্রবণতাকে মুছে ফেলে না, তবে হারানো চুল ফিরিয়ে আনে। ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে চুল পাকার গতি ধীর করা সম্ভব। এ ছাড়া সাময়িকভাবে চুল ঢাকতে মানসম্মত ডাই বা হেয়ার কালার ব্যবহার করা যেতে পারে।
জিনের প্রভাবে চুল পাকা বা পাতলা হওয়াকে শতভাগ থামানো না গেলেও, সঠিক সময়ে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করে একটি সঠিক লাইফস্টাইল ও চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করলে চুলের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।


