যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ বাড়ায় দ্বিতীয় ডোজ আগেভাগে দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক

যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে; নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক সন্তানদের আগেভাগে টিকা দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন, বিশেষ করে হাম, মাম্পস ও রুবেলার (এমএমআর) টিকার দ্বিতীয় ডোজটি, যা প্রথম ডোজের মাত্র চার সপ্তাহ পরেই দেওয়া যায়।
দ্বিতীয় ডোজটি প্রথমটির পরপরই দেওয়ার এই পদ্ধতি জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো কয়েকটি দেশের নির্দেশনার সঙ্গে মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, এটিও একটি বিকল্প।
ওয়াশিংটনের সিয়াটলের প্রাকৃতিক চিকিৎসক ও টিকা-সমর্থক এলিয়াস কাস বলেন, আরও বেশি অভিভাবক ‘আগেভাগে’ টিকা দেওয়ার কথা শুনেছেন। সিডিসি সাধারণত এক বছর বয়সের পর প্রথম এমএমআর ডোজ এবং চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু কয়েক বছর আগে হামের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে কাস ১৫ মাস বয়সে এমএমআরভি টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিতে শুরু করেন; এই টিকায় দ্বিতীয় এমএমআর ও জলবসন্তের টিকা একসঙ্গে থাকে।
কাস বলেন, এখন আরও বেশি অভিভাবক সেই পরামর্শ নিচ্ছেন, এবং তাঁদের ভাবনা একেবারে সোজা: ‘অপেক্ষা করার কোনো কারণ নেই, হাম এখন এখানেই আছে।’
শিকাগোর মা মার্গট টেলরের তিনটি ছোট সন্তানের এমএমআর টিকার ইতিহাস তিন রকম। টেলর বলেন, ‘তিনজনই পুরোপুরি টিকা পেয়েছে, কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় টিকাগুলো এগিয়ে আনতে হয়েছে। আমরা অনেকটা পেছনে চলে গেছি।’
তাঁর বড় সন্তান ২০১৯ সালে জন্মেছে; সে এক বছর ও চার বছর বয়সে ডোজ পেয়েছে। টেলর বলেন, তখন হাম তাঁর ভাবনাতেই ছিল না। কিন্তু ২০২৩ সালে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে শিশুরোগ চিকিৎসক দুই বছর বয়সেই দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি বিস্মিত হন; শিকাগো তখন হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়ছিল, তাই তাঁরা ডোজটি দিয়ে দেন।
২০২৫ সালে জন্ম নেওয়া তৃতীয় সন্তান প্রথম জন্মদিনের পর প্রথম ডোজ পেয়েছে, আর তার মাত্র তিন মাস পর জুনে পেয়েছে দ্বিতীয় ডোজ।
টেলর শঙ্কায় ছিলেন, এত আগেভাগে দিলে টিকা হয়তো ততটা ভালো কাজ করবে না। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ বলছে, আগের বয়সেও টিকা ভালোভাবে কাজ করে; চার থেকে ছয় বছরে দ্বিতীয় ডোজের পরামর্শটি মূলত ব্যবস্থাপনাগত কারণে—যাতে শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে ঢোকার আগেই দুটি ডোজ পায় এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সংখ্যা কমে, কারণ ওই বয়সগুলোতে অন্য টিকাও দেওয়া হয়।
টেলর জানেন এমএমআর টিকা কতটা জরুরি। তৃতীয় মেয়েটি প্রথম ডোজ পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই পশ্চিম টেক্সাসের প্রাদুর্ভাবের সময় একটি বিমানবন্দরে হামের সংস্পর্শে এসেছিল। মাত্র এক মাস বয়সী শিশুটির পরে জ্বর হলে তাঁরা হাসপাতালে ছুটে যান এবং পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল না আসা পর্যন্ত নেগেটিভ-প্রেশার কক্ষে থাকেন।
জার্মানিতেও ২০০১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সুপারিশ ছিল। ওই বছর একটি প্রাদুর্ভাবে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঢেউ এলে দেশটি প্রথম ডোজ ১১ থেকে ১৪ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৮ থেকে ২৩ মাসে দেওয়ার সুপারিশ করে। ২০২০ সালে তারা দ্বিতীয় ডোজটি প্রথমটির চার সপ্তাহ পরে নিয়ে আসে।
জার্মানির বিজ্ঞানী ক্যাথেরিনা বেকার বলেন, যেকোনো ছন্দে দুবার টিকা পাওয়া কোনো শিশুর হামের ঝুঁকি পুরোনো নিয়মে টিকা পাওয়া কারও চেয়ে বেশি—এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত নেই। তাঁর মতে, দ্বিতীয় ডোজ আগেভাগে দেওয়ার বিষয়ে সিডিসির আরও জোরালো সুপারিশ বিবেচনা করা ‘অবশ্যই’ উচিত। তাঁর নিজের ছেলে আড়াই বছর বয়সে দ্বিতীয় হামের টিকা পেয়েছিল, এবং সেটিও দেরি হয়েছিল কেবল জলবসন্ত থেকে সেরে ওঠার কারণে।
কিছু অভিভাবক ছয় মাস বয়সেই শিশুদের প্রথম ডোজ দেওয়ার পথও বেছে নিচ্ছেন। প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকায়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের আগে এবং হামের সংস্পর্শে আসার পর সিডিসি এই ডোজের পরামর্শ দেয়। যেসব শিশু আগেভাগে প্রথম ডোজ পায়, তাদের তৃতীয় একটি ডোজও নিতে হয়।
গর্ভধারণের আগে মা হামের টিকা পেয়ে থাকলে সেই প্রতিরোধ ক্ষমতা গর্ভাবস্থায় শিশুর মধ্যেও যায়, ফলে জীবনের প্রথম কয়েক মাস শিশুটি সুরক্ষিত থাকে। এ কারণেই আগেভাগে প্রথম ডোজ পাওয়া শিশুদের তৃতীয় ডোজের পরামর্শ দেওয়া হয়—ছয় মাস বয়সে শিশুর শরীরে মায়ের অ্যান্টিবডি থেকে যাওয়া সম্ভব, ফলে টিকায় শক্তিশালী সাড়া তৈরি নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় এমএমআর ডোজ অন্য বুস্টারগুলোর চেয়ে আলাদা। বেশির ভাগ মানুষ প্রথম ডোজেই শক্তিশালী সাড়া তৈরি করে, তাই ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত একটি ডোজই সুপারিশ করা হতো। পরে বিজ্ঞানীরা দেখেন, কেউ কেউ প্রথম ডোজে সাড়া দেয় না এবং তাদের দ্বিতীয় ডোজ দরকার হয়। এ কারণেই ১৯৮৯ সালের আগে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের এখন দ্বিতীয় ডোজের প্রয়োজন হতে পারে। কাসের ভাষায়, এটি ‘প্রথমবারের মতো সাড়া দেওয়ার দ্বিতীয় সুযোগ’।
বেকার টিকার কার্যকারিতা বুঝতে অতীতের প্রাদুর্ভাবের দিকে তাকান। ১৯৯৮ সালে আলাস্কার একটি প্রাদুর্ভাবে একটি স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থী—মোট ২ হাজার ১৮৬ জন—হামের টিকা পাওয়া থাকায় মাত্র ১৭ জন অসুস্থ হয়েছিল। এর বিপরীতে ২০১০ সালে জার্মানির একটি ওয়াল্ডর্ফ স্কুলে ৩০০ শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক টিকা না পাওয়ায় ৭১ জন অসুস্থ হয়। বেকার বলেন, ‘এটাই দেখায় হামের টিকা আপনার জন্য কী করে—এই রোগ থেকে এটি আপনাকে রক্ষা করে।’



