আঙ্কারায় তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ সম্মেলন: পরিবহন, জ্বালানি ও বাণিজ্যে সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নতুন সুযোগ তৈরি করায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পরিবহন প্রকল্পসহ পরিবহন, জ্বালানি ও বাণিজ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে তুর্কি রাষ্ট্রগুলো। আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে এসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনে এক বিস্ময়কর প্রস্তাবে কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ত তোকায়েভ রাশিয়াকে তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর সংস্থায় (ওটিএস) এর ‘ওটিএস প্লাস’ কাঠামোর মাধ্যমে কিংবা পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষায়, এতে ‘আমাদের সংস্থার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে’। রাশিয়ার অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আয়োজনে সংস্থাটির ১৩তম শীর্ষ সম্মেলনটি আঙ্কারা ঘোষণা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
ওটিএসের সদস্য দেশ তুরস্ক, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তান। সম্মেলনে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট সেরদার বেরদিমুহামেদভ অংশ নেন, আর আজারবাইজানের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বায়রামভ। সংস্থাটির আবর্তনশীল সভাপতিত্ব আজারবাইজান থেকে তুরস্কের হাতে গেছে।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন এরদোয়ান, তবে তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাণিজ্যে বাস্তব সহযোগিতা। তিনি একটি অভিন্ন ডিজিটাল বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম এবং ওঘুজ, কিপচাক ও কারলুক ভাষাগোষ্ঠীকে আওতায় আনা একটি যৌথ তুর্কি বৃহৎ ভাষা মডেলের প্রস্তাব দেন।
আঙ্কারা ঘোষণায় একটি সাইবার নিরাপত্তা চুক্তির দিকে অগ্রগতি এবং একটি ওটিএস সাইবার নিরাপত্তা পরিষদ গঠন নিয়ে পরামর্শের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে একটি যৌথ ১২ইউ কিউবস্যাট সম্পন্ন হওয়া এবং মহাকাশ-শিল্প সহযোগিতা নিয়ে একটি কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানানো হয়।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ তৃতীয় দেশগুলোকে নিয়ে ‘তুর্কি রাষ্ট্র সংস্থা প্লাস’ কাঠামোর মাধ্যমে সংস্থাটির আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি ১০০টি কৌশলগত যৌথ বিনিয়োগ ও শিল্প প্রকল্প নিয়ে ‘তুর্কি বিশ্ব – ১০০’ কর্মসূচির প্রস্তাব দেন, যেখানে বিরল ও কৌশলগত খনিজের পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণ, সবুজ জ্বালানির সরঞ্জাম উৎপাদন স্থানীয়করণ এবং উচ্চ মূল্য-সংযোজিত পণ্য তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়।
পরিবহন সংযোগের বিষয়ে মিরজিয়োয়েভ মিডল করিডর ও সংযুক্ত রুটগুলোকে যৌথভাবে পরিচালিত লজিস্টিক হাবসহ একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর অন্য প্রস্তাবের মধ্যে ছিল বাণিজ্যিক বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তার বহুপক্ষীয় চুক্তি, একটি তুর্কি পর্যটন জোট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সহজ ভ্রমণ।
তোকায়েভ ক্যাস্পিয়ান সাগর ও দক্ষিণ ককেশাস হয়ে মধ্য এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করা মিডল করিডরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জানান, বছরের প্রথম নয় মাসে এই রুটে মালামাল পরিবহন ৩০ শতাংশ বেড়েছে, ট্রানজিট চালান বেড়েছে ৯০ শতাংশ, আর কাজাখস্তান ও ওটিএস দেশগুলোর মধ্যে রেল মালামাল পরিবহন প্রায় ৪ কোটি টনে পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় বাজারের জন্য এই রুট রাশিয়া পেরিয়ে যাওয়া পরিবহন সংযোগের বিকল্প দিলেও বন্দরের ধারণক্ষমতা, সীমান্ত প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোর ঘাটতি এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তোকায়েভ সাইবার নিরাপত্তায় ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ওটিএসের সামরিক জোটে পরিণত হওয়া উচিত নয় এবং ভবিষ্যতেও হবে না — এটাই কাজাখস্তানের অবস্থান।
কিরগিজ প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথকে মিডল করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেন এবং ২০২৭ সালের ৫-৬ আগস্ট একটি অনানুষ্ঠানিক ওটিএস শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেন। বেরদিমুহামেদভ বলেন, ক্যাস্পিয়ান পেরিয়ে ট্রানজিট বাড়াতে তুর্কমেনবাশি বন্দরের অবকাঠামো ব্যবহার করতে তুর্কমেনিস্তান প্রস্তুত।
শীর্ষ সম্মেলনের আগে এরদোয়ান উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। কাজাখ প্রেসিডেন্ট তোকায়েভের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে (প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো) বাড়ানোর লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন এরদোয়ান। সম্মেলনে উজবেকিস্তানের মিরভোখিদ আজিমভকে ওটিএসের আগামী মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়।




