পোর্ট সুদানে পানির দামে নাকাল পরিবারগুলো: এক মাসের বেতন চলে যায় শুধু পানি কিনতেই
সুদানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোর্ট সুদানের দেইম মায়ো এলাকার বাসিন্দা আমিনা খালাফাল্লাহ প্রতিদিন নিজের ও চার সন্তানের জন্য পানি কিনতে ১০ হাজার সুদানি পাউন্ড খরচ করেন, যা সমান্তরাল বাজারের হিসাবে প্রায় ১ ডলার। ৩০ দিনের মাসে এই খরচ দাঁড়ায় ৩ লাখ পাউন্ড, প্রায় ৩০ ডলার, যা তাঁর পুরো মাসের বেতনের সমান।
খালাফাল্লাহর বাড়িতে পাইপলাইনের পানির সংযোগ নেই। তাঁকে নির্ভর করতে হয় রাস্তার বিক্রেতাদের ওপর, যারা ১৮ লিটার পানির দাম নেন ১ হাজার পাউন্ড, প্রায় শূন্য দশমিক ১০ ডলার।
খালাফাল্লাহ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়ায় কাজ করেন, আর তাঁর স্বামী অন্য অঙ্গরাজ্যে কাজ করেন এবং পারলে মাঝে মাঝে টাকা পাঠান। দুজনের আয় মিলিয়েও পরিবারটি কোনো রকমে চলে, আর খালাফাল্লাহ জানিয়েছেন, প্রায়ই তাঁকে টাকা ধার করতে হয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাবে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ সুদানের গড় আয়কে ১৯৯০-এর দশকের শুরুর পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে। গরমের মাসগুলোতে পানির দাম আরও বাড়ে এবং বিক্রেতাদের পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। খালাফাল্লাহ বলেন, গ্রীষ্মে অন্যান্য ঘরোয়া প্রয়োজন মেটানোর আগেই তাঁরা পানির জন্য টাকা আলাদা করে রাখেন, প্রয়োজনে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়াই চলতে হয়।
আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এএফডিবি) মতে, নিরাপদ পানির সুবিধা সুদানের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলোর একটি, যেখানে লাখ লাখ শিশু পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
দেশের অন্য এলাকার লড়াই থেকে তুলনামূলক নিরাপদ পোর্ট সুদানে যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন আগে থেকেই ভঙ্গুর অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এএফডিবি জানিয়েছে, শহরটির পানি সরবরাহ চাহিদার ৪০ শতাংশেরও কম মেটাতে পারছে।
পোর্ট সুদানের বড় সমস্যাগুলোর একটি আরবাত বাঁধ ধসে পড়া। লোহিত সাগরের পাহাড়ি এলাকায়, শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই বাঁধ একসময় উপকূলীয় শহরটির দৈনিক পানির চাহিদার অর্ধেক জোগাত। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় বাঁধটি ধসে পড়ে, নিচের গ্রামগুলো ধ্বংস হয় এবং পাইপলাইন ও কূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পুরো এলাকাগুলো এখন ট্রাকে করে আনা ব্যয়বহুল পানির ওপর নির্ভরশীল।
৩০ বছর বয়সী আহমেদ ওসমান গত তিন বছর ধরে একটি পানি বিতরণ কেন্দ্রে কাজ করছেন, যেখান থেকে রাস্তার বিক্রেতারা বাড়ি বাড়ি পানি পৌঁছে দেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুদ্ধ শুরুর সময় ওসমান অন্তত ২৫০ লিটার পানি বহনকারী গাধার গাড়ি ভরতে বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৪ হাজার পাউন্ড নিতেন। পরিচালন ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই দাম অনেক বেড়েছে।
ওসমান বলেন, ৫০ হাজার লিটার পানি বহনকারী একটি ট্যাংকারের দাম এখন ১৫ লাখ পাউন্ড, প্রায় ১৫০ ডলার, যেখানে যুদ্ধের আগে তা ছিল প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পাউন্ড। তিনি পানি সংরক্ষণ ট্যাংকে রেখে বিক্রেতাদের গাড়িতে তোলেন এবং ২৫০ লিটারের গাড়ি ভরতে ১৬ হাজার পাউন্ড নেন। খরচের পর তাঁর দৈনিক মুনাফা থাকে প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড, যা তিনি ও তাঁর অংশীদার ভাগ করে নেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পানি নেটওয়ার্কের কিছু অংশ মেরামতের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ইউএনডিপি জানিয়েছে, এই কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি নলকূপ খনন বা মেরামত, ১৭ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন বসানো এবং সৌরচালিত পাম্প স্থাপন। সংস্থাটির হিসাবে, পুনরুদ্ধার করা ব্যবস্থাটি প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে পানি সরবরাহ করতে পারবে। তবে ইউএনডিপির হিসাব অনুযায়ী এখন ১০ লাখ জনসংখ্যার পোর্ট সুদানের সবার জন্য তা যথেষ্ট হবে না।
এ কারণে আরও প্রকল্প প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে, যার মধ্যে জুনে এএফডিবি ও ইউনিসেফের শুরু করা একটি প্রকল্প রয়েছে, যার লক্ষ্য শহরের ৭ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত মানুষের নিরাপদ পানির সুবিধা সম্প্রসারণ।
পোর্ট সুদান টিচিং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা পরিচালক ইমাদ হাফেজ বলেন, পানির সংকট জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং পরিবারগুলোর পক্ষে মৌলিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন করে তুলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিবারগুলো অপরিশোধিত পানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতে পারে, এতে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ও জনাকীর্ণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে কলেরা ও অন্যান্য ডায়রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
হাফেজ আরও বলেন, পানির ঘাটতিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হলে ত্বকের সংক্রমণসহ পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বাড়ে, আর ঢাকনাহীন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখলে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়ে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। হাসপাতালগুলোর জন্যও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ জরুরি বলে তিনি জানান, কারণ সংক্রমণ প্রতিরোধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রোগীর সেবায় পানি লাগে। তাঁর মতে, পানির অনিরাপত্তা কৃষিকাজ ব্যাহত করে খাদ্য ঘাটতি ও অপুষ্টিও বাড়াতে পারে, যেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।


