আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি: বিশ্বের নানা দেশে জরুরি মজুত গড়ছেন সাধারণ মানুষ

জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে ঘরে কী কী মজুত রাখতে হবে, যুক্তরাজ্য সরকার ঘরোয়া পর্যায়ে সেই পরামর্শ দেওয়ার পর দেশটির কিছু দোকানে টিনজাত খাবার, রেডিও আর টর্চের বিক্রি বেড়ে গেছে। ব্যক্তিগত এই ‘সংকটকালীন কিট’ যুক্তরাজ্যের জন্য নতুন হলেও বিশ্বের অনেক দেশেই এটি বহুদিনের চেনা অভ্যাস। চরম আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে থাকা দেশগুলো নিয়মিত প্রস্তুতির নির্দেশনা দেয়; কোনো কোনো দেশ এমনকি প্রতিটি বাড়িতে বইপত্র পৌঁছে দেয়।
সুইডেনের ৩০ বছর বয়সী আন্দ্রেয়াস ওয়েনারবার্গের প্রস্তুতির শুরুটা এমনই এক সরকারি বই থেকে। দুই বছর আগে তাঁর দরজায় পৌঁছায় একটি বই, যা সুইডেনের প্রতিটি পরিবারে পাঠানো হয়েছিল; তাতে লেখা ছিল ‘সংকট বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে’ কী মজুত করতে হবে আর কীভাবে আচরণ করতে হবে। স্টকহোমে বসবাসকারী আন্দ্রেয়াস তাঁর বেসমেন্টে তুলনামূলক ছোট একটি মজুত গড়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে হাতে ঘোরানো (ক্র্যাংক) রেডিও, ১০ লিটার পানির ট্যাংক আর নগদ প্রায় ২০০ ইউরো (১৭০ পাউন্ড); কয়েকটি জিনিস তাঁর আগে থেকেই ছিল। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ঘুম ভাঙানোর মতো একটি ‘জাগরণের ডাক’, যদিও তিনি স্বীকার করেন, নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ফিজিওথেরাপিস্ট ড্যান সি-র প্রস্তুতি শুরু বাবা হওয়ার পর। ৩৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তির দুই সন্তানই ১০ বছরের কম বয়সী; বেসমেন্টের তাকে সাজানো মজুতের পেছনে তিনি এখন পর্যন্ত খরচ করেছেন প্রায় ৬,০০০ ডলার (৪,৪৭০ পাউন্ড)। তাঁর কথায়, ‘বাবা হিসেবে এটা আমার দায়িত্বের অংশ।’
কয়েক বছর আগে এক অত্যন্ত ঠান্ডা ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বাড়ি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং পরিবারটি দুই দিন বিদ্যুৎ ছাড়া ছিল। তত দিনে মজুত শুরু করলেও তখন তিনি দেখেছিলেন, তাঁর প্রস্তুতিতে ‘অনেক ফাঁক’ রয়ে গেছে। এখন তাঁর সংগ্রহে আছে ১৫০ গ্যালন পানি এবং বাথটাবে ভরে রাখা যায় এমন নরম প্লাস্টিকের বড় পানির পাত্র। আছে ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড ট্যাবলেটও, যা ঝরনা বা নদীর পানি পানযোগ্য করতে ব্যবহৃত হয়।
ড্যানের ‘ঘূর্ণায়মান প্যান্ট্রি’তে রয়েছে ওটস, কিনোয়া আর পিনাট বাটারের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাবার, যা নিয়মিত রান্নায় ব্যবহার করে আবার পূরণ করা হয়, যাতে মেয়াদ শেষ হয়ে পড়ে না থাকে। চারজনের পরিবারের জন্য তাঁর কাছে রয়েছে প্রায় তিন মাসের খাবার। এ ছাড়া আছে সোলার প্যানেল, ক্যাম্পিং স্টোভ, তাঁবু, কাঠের মজুত এবং বিদ্যুৎ বা কাঠ ছাড়াই চালানো যায় এমন প্রোপেন ফায়ারপ্লেস ইনসার্ট। রক্তপাত নিয়ন্ত্রণের কিটসহ বিস্তৃত চিকিৎসা সরঞ্জামও রেখেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (ফেমা) মানুষকে জরুরি কিট তৈরি, পারিবারিক জরুরি পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন ঘটনায় কীভাবে সাড়া দিতে হয় তা জেনে রাখার পরামর্শ দেয়। ড্যানের মতে, জরুরি পরিকল্পনায় ‘সবচেয়ে খারাপটাই ভাবার’ প্রবণতা থাকতে পারে, তবে তাঁর কাছে এটি একজন ‘দায়িত্বশীল বাড়ির মালিক’ হওয়ার বিষয়।
জাপানের টোকিওর বাসিন্দা আয়ুমি টি ভূমিকম্প, টাইফুন আর চরম গরমের মতো ঘটনার জন্য বছরের পর বছর ধরে একটি জরুরি ব্যাগ রেখে আসছেন। তবে ২০২৪ সালে নোতো উপদ্বীপে ভূমিকম্পে শত শত মানুষের মৃত্যু ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর তিনি মজুত আরও বাড়িয়েছেন। টোকিও সরকারের ৬৮ পৃষ্ঠার দুর্যোগ প্রতিরোধ নির্দেশিকায় জরুরি কিটে কী রাখতে হবে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা বিস্তারিত বলা আছে।
আলমারিতে রাখা আয়ুমির জরুরি রাকস্যাকে আছে পোশাক, তোয়ালে, মাসিকের পণ্য, একবার ব্যবহারযোগ্য চপস্টিক, স্টিকি নোট, একবার ব্যবহারযোগ্য মাস্ক এবং পর্বতারোহী ও ক্যাম্পারদের ব্যবহৃত ধরনের একটি বহনযোগ্য টয়লেট। ২৭ বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী বলেন, ‘এর অনেক কিছুই পুরোনো জিনিস, যেগুলো আমি আর ব্যবহার করি না।’ প্রতি নববর্ষে তাঁর পরিবার কিটগুলো পরীক্ষা করে এবং প্রয়োজনে হালনাগাদ করে, যেমন মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বদলে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার নেতৃত্ব প্রশিক্ষক (লিডারশিপ কোচ) নিকোল বন্ডসের গত পাঁচ বছর ধরেই মনে প্রশ্ন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে কী হবে?’ ৪৮ বছর বয়সী নিকোল এর কারণ হিসেবে দেখেন বিশ্বজুড়ে ‘যথেষ্ট বেশি’ তীব্র আবহাওয়া ও ঝড় এবং প্রস্তুতির অভাব। তাঁর মূলমন্ত্র, ‘আতঙ্কিত হোয়ো না, প্রস্তুত থাকো।’ প্রচুর পরিষ্কারক ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর পাশাপাশি তিনি কিনেছেন ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, রিচার্জেবল পাখা, কম্বল আর স্লিপিং ব্যাগ। খরচ সামলাতে তিনি ‘এখানে-ওখানে’ অল্প অল্প করে সরঞ্জাম কিনে ধীরে ধীরে মজুত গড়েন; জিনিসপত্র রাখেন বিছানার নিচে, প্যাকিং ব্যাগে আর রান্নাঘরের আলমারিতে।
নেদারল্যান্ডসের মাইকেল স্টুট যেখানে থাকেন, সেই জায়গা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। হর্ন শহরে স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে থাকা ৩৯ বছর বয়সী মাইকেল চরম আবহাওয়া নিয়ে চিন্তিত, আবার সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়েও। কয়েক বছর আগে তিনি কিট তৈরি শুরু করেন। খাবারের পাশাপাশি তাঁর কাছে বিদ্যুৎ-সরঞ্জামের ভালো মজুত আছে, যার মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য ছোট ও হালকা স্যাটেলাইট যন্ত্র স্টারলিংক মিনি। সরঞ্জাম রাখেন চিলেকোঠায় আর বাড়ির নিচের সরু জায়গায় (ক্রল স্পেস); সেখানে আছে প্রায় ১২০ লিটার পানি, নগদ অর্থ, প্রাথমিক চিকিৎসার কিট আর একটি জেনারেটর। এ বছরের শুরুতে খাবারের মজুত ও মেয়াদ শেষের তারিখ লিপিবদ্ধ করতে তিনি একটি অ্যাপও তৈরি করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘প্রস্তুত থাকা মানে আতঙ্ক নয়; আলো নিভে গেলে শান্ত থাকা মানুষটি হওয়াই আসল কথা।’
২০২৫ সালের শেষ দিকে ডাচ কর্তৃপক্ষ একটি প্রচারণা চালায়, যেখানে পরিবারগুলোকে ৭২ ঘণ্টার সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়, যেমনটা যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষও সম্প্রতি করেছে। প্রস্তুতির শুরুতে মাইকেলের স্ত্রী প্রয়োজনটা বুঝতেন না, তবে এখন তিনি গুরুত্বটা বোঝেন বলে মাইকেল জানান। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে তাঁরা বলেছেন, এই সরঞ্জাম শুধু দোকানে যেতে না চাইলে কাজে লাগানোর জন্য, কারণ তাঁরা ছেলেকে ‘ভারাক্রান্ত করতে চান না’। তিন দিনের এই পরামর্শ নিয়ে মাইকেল সংশয়ী, যুক্তরাজ্যেও একই সময়সীমার সুপারিশ করা হয়েছে; তবে তাঁর মতে, ‘প্রতিটি পরিবারের ঘরে কিছু মৌলিক জিনিস থাকলে জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর পক্ষে সবচেয়ে বেশি সাহায্য প্রয়োজন এমন মানুষদের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।’




