ইয়েরেভানে প্রায় ২০০ দেশের সমঝোতা: প্রকৃতি রক্ষায় নতুন কর্মপরিকল্পনায় ঐকমত্য, অর্থায়নেই বড় ঘাটতি

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনার পর প্রায় ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা প্রকৃতি রক্ষায় নতুন কর্মপরিকল্পনার মূল অংশগুলোতে একমত হয়েছেন। আলোচনা শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার ভোরের দিকে এই সমঝোতা হয়।
সভার সভাপতি হাম্বার্দজুম মাতেভোসিয়ান সমঝোতার মুহূর্তে বলেন, ‘এবং এটাই। নিখুঁত।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকটি ঘিরে প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র মতভেদ ও তর্ক চলছিল।
এর চার বছর আগে, ২০২২ সালে, একই দেশগুলো প্রকৃতির পতন থামানো ও উল্টে দেওয়ার অঙ্গীকার করে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই করেছিল। গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক নামের ওই চুক্তিতে ২৪টি লক্ষ্য ছিল, যার মধ্যে দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বের স্থল ও সমুদ্রের ৩০ শতাংশ সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যও ছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব বর্তমানে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির মধ্যে রয়েছে, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রজাতিগুলো প্রাকৃতিক হারের চেয়ে ১০০ গুণ দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। কিন্তু জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব ওই দুই ডজন লক্ষ্যের মাত্র একটি অর্জনের পথে রয়েছে।
এবারের চুক্তিতে দেশগুলো স্বীকার করেছে যে তারা পিছিয়ে পড়ছে। পরিবেশ সংস্থা ফনা অ্যান্ড ফ্লোরার ক্যাথরিন ওয়েলার বলেছেন, বিষয়টি খুব উত্তেজনাপূর্ণ বা বিস্তারিত না হলেও দেশগুলো একমত হতে পারা সুখবর। তিনি বলেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত এভাবে ধীরে এগোনো যাবে না, পথ সংশোধন দরকার; প্রকৃতি পৃথিবীর সব প্রাণের জন্য, অর্থনীতি ও সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য।
দ্য ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টসের প্রধান নির্বাহী ক্রেইগ বেনেট বিবিসি নিউজকে বলেছেন, এখনো ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে বাস্তুতন্ত্রের পতনের হুমকি তৈরি করছে। তবে তিনি এও বলেছেন, সারা বিশ্বে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়ার অনেক উদাহরণ রয়েছে, সেটাই ভালো খবর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশগুলো ৬২ কোটি ৩০ লাখ একর, অর্থাৎ ২৫ কোটি ২০ লাখ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত জমি সুরক্ষার আওতায় এনেছে, যা গ্রিনল্যান্ডের চেয়েও বড় এলাকা। গত মাসে ডব্লিউডব্লিউএফ হাতি, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ ও বাঘসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির পুনরুদ্ধারে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে।
তবে দেশগুলো স্বীকার করেছে, এসব প্রচেষ্টা দ্রুত করার প্রধান বাধা অর্থ। ২০২২ সালে দেশগুলো দশকের শেষ নাগাদ প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে ৩ হাজার কোটি ডলার দেওয়ার এবং বেসরকারি উৎস থেকে আরও ১৭ হাজার কোটি ডলার জোগাড়ের অঙ্গীকার করেছিল।
কিন্তু এরপর অনেক দেশ আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রতিরক্ষা বাজেট ও বারবার আসা জ্বালানি ধাক্কা সামলাতে সরিয়ে নেওয়ায় প্রতিশ্রুতি প্রয়োজনীয় হারে আসছে না বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। এবারের বৈঠকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি প্রতিশ্রুতি এসেছে, যার অর্ধেক এসেছে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর রি:ওয়াইল্ড সংস্থাসহ দাতব্য দাতাদের কাছ থেকে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষক আনা ডুক্রোস বলেছেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পে ভর্তুকি কমানোর অঙ্গীকারে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সরকারগুলো বড় আকারের মাছ ধরায়, যেমন ট্রলিংয়ে, ভর্তুকি দেয়, যা প্রকৃতির জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। তাঁর ভাষায়, সরকার এখন দুইবার অর্থ দিচ্ছে—একদিকে প্রকৃতি ও জলবায়ুতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন জানলেও অন্যদিকে প্রকৃতির ক্ষতি করছে।
পরিবেশ থেকে পাওয়া জিনগত উপাদান ব্যবহার করে মুনাফা করা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর অনুদানের জন্য আগে গঠিত ক্যালি ফান্ড নিয়েও অগ্রগতি কম হয়েছে। ধারণা ছিল এই তহবিলে বছরে ৩৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, কিন্তু বৈঠকের শুরুতে প্রতিশ্রুতি ছিল মাত্র ১০ হাজার ডলার। বেনেট স্বীকার করেছেন, তহবিলটি স্বেচ্ছামূলক হওয়ায় কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ দেওয়া কঠিন।
বৈঠকে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেদন অনুমোদনের মতো তুলনামূলক সহজ বিষয়টিও বিতর্কে আটকায়। সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ ছোট একটি দেশগোষ্ঠী ওই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে জানানো হয়েছে। ফ্রান্সের পরিবেশ রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী মোনিক বারবুত এএফপিকে বলেছেন, বিজ্ঞানের ওপর আক্রমণ তাঁকে খুব বিরক্ত করেছে।
আগামী মাসে দেশগুলো বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ মিলিত হবে। এর নিজস্ব বিজ্ঞান সংস্থা আইপিসিসিও গত এক মাসে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন পাস করা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা নিয়ে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লি বলেছেন, আইপিসিসি রাজনৈতিক কৌশলের জায়গা নয়, কারণ এর কাজের ফল মানবতার স্বার্থে।




